Showing posts with label . Show all posts
Showing posts with label . Show all posts

বস্তিউজাড়

—আহমদ ছফা

প্রাণ ধারণের টানে দলে দলে গ্রামীন মানুষ
চৌদ্দ পুরুষের ভিটি লাঙ্গলের মায়া
মাটির নিবিড় টান-শরিকী বিবাদ
গরুর মুতের ঘ্রাণ, বীর হানিফার সেই
পুঁথির জগত আর জ্যোস্নালোকে ভাসমান
কন্যা সোনাভান সমস্ত পেছনে রেখে
মধুতে পিঁপড়ের মত
এ শহরে ভির করে বেঁধে আছে নীড়।

কার ছেলে কার নাতি কে রাখে হিসেব
ট্রেন চেপে বাসে চড়ে, লরীতে নৌকোয়
আঁকাবাঁকা হাঁটা পথে, দুর্ভিক্ষের থাবা দেখে
জুজুল বাঘের মত বেরহম ক্ষুদার পীড়নে
অজন্মার অত্যাচারে, বন্যার ডাকাত স্রোতে
ভেসে ভেসে পাহাড়ি আগাছা প্রায়
ভ্রষ্ট নীড় গ্রামীণ মানুষ
রসাল গল্পের মত মুগ্ধ চোখে পড়েছে শহর।

আলোকের মালা জ্বলে, রাজপথ ফুল্লমুখী
পরীদের ঝাঁক, দুপুর বিকেল কেমন মাতিয়ে রাখে
শ্রীচরণে স্পন্দমান সঙ্গীতেন তান।
বাস্প হাওয়া জল আর আসমানের চঞ্চল বিজুলি
বিনীত সেবক সেজে এ শহরে দিচ্ছে অঞ্জলি
গাড়ি ঘোড়া বেগে ধায়, কল টিপে জল
হাওয়া ঝরে হাওয়া-কলে
আঙ্গুলের মত সুখ থোকা থোকা ঝুলছে শহরে
শহর চমৎকার।

মা-হারা সন্তান প্রায় গ্রামহীন মানুষেরা এসে
জড়ো হয় শহরের ফাঁকা মাঠে সভ্যতার কীট
বারোয়ারি প্রয়োজনে প্রাণে প্রাণে গিট
বেঁধে বাঁশ কাঠে গড়ে তোলে নড়বড়ে নতুন নিবাস।

মিন্তি কেউ মোট বয়, রিকশা টানে
যোগালির কাজ করে অফিসে আর্দালী
এটা আনে সেটা বেচে, ছাতা মেরামত করে খায়
প্রকাণ্ড চাবির রিং ঘুরে ঘুরে ঝিমঝিম দুপুরে বাজায়,
গহনরাতের চোর, সুদক্ষ জুয়ারি ভাগ্যবান কেউ কেউ
পকেটে চালায় কাচি, বেশ্যার দালালি করে
কালো সন্ধাবেলা। সোমত্ত সধবা দল মাতারির
কাজ করে গিয়ে বাড়ি বাড়ি, রান্না করে
আবিয়েতা মেসেমেসজীবী সাহেবেরা
অবসরে শিখে নেয় ডাগর-ডোগর প্রেমের সুমধুর পাঠ।
ধর্মভীরু আছে কেউ, হাওয়ায় অমঙ্গল দেখে দুবেলা রাঙিয়ে চোখ
ক্রুদ্ধ কণ্ঠে করে ওঠে অসার তর্জন, মিলাদ লাগায় জোরে
গোটা রাত ভোর ধর্মকণ্ঠে ঝরে একটানা অশান্ত চ্যাচানি।
মানে না বারণ তবু পাপস্রোত হু হু করে বাড়ে
যেমন নদীর জলে লেগেছে জোয়ার।
মাঝে মাঝে মারামারি চাঁটগা কিংবা নোয়াখালী
বরিশাল ফরিদপুর ইত্যাকার নামগুলো
জ্বল জ্বল জ্বলে ওঠে মানে না শাসন
একটুও আশ্চর্য নয় দুয়েকটা হয়ে যায় আচমকা খুন।

এই তো জীবনরঙ্গ কিষাণের স্বপ্নের শহর
এখানে জীবন কাটে স্বপ্নহীন, তবু আছে স্বপ্নের তলানি
রাঙা বুদবুদের মত প্রাণের গভীরতল ভেদ করে
জেগে ওঠে জীবনের অন্তহীন আকাঙ্খার ফুল,
বস্তিতেও সঙ্গীত শিহরে, বুকে বুকে ভালবাসা
জোনাকির মত ভিড় করে
নিবিড় নিদ্রার পটে ছেড়া কাঁথা ফুঁড়ে
কম্পিত নক্ষত্র-শিখা স্বপ্ন হয়ে ঝরে।

মুলিবাঁশ দিয়ে গড়া খোপ খোপ ঘরগুলো
যেন মধুচক্র, ভরে রাখে শিশুকণ্ঠ নারীর কাকলি
সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না পালাক্রমে করে লুকোচুরি
হাজার নালিশ তবু, ঘরকান্না চলে নিরিবিলি।
চারদিকে মন্বস্তর দেশ জুড়ে সেয়ানা আকাল
তেলে ঘিয়ে একদর, মৃত্যু কি জীবন ভাল
পায় না তো খুঁজে কেন তাল।বড়বেশি চোখাম্বরে
হাওয়ায় চিৎকারে ভাসে রক্তময় যুগের রোদন
বস্তবাসী মানুষের চোখে ঘন পিচুটির মত
হতাশার গাঢ় আবরণ ক্রমে ক্রমে শক্ত হয়ে জমে।

মৃত্যু কিংবা জীবনের গন্তব্যবিহীন— এইসব গ্রামহারা মানুষের
মনে
কখনো-সখনো হানা দেয় বেপরোয়া দামাল জীবন,
চঞ্চল স্রোতের বেগে জেগে ওঠে অগণন মানুষের সারি
সম্মুখে ধাবিত হয়, বিক্ষোভে মুখিয়ে ওঠে
ঝাণ্ডা তোলে হাতে চ্যাংড়া শোলের মত
লাফ দিয়ে প্রখ্যাত নেতার নামে করে জয়ধ্বনি—
শতবর্ষ বেঁচে থাক তুমিই ধর্মের বাপ তুমি মা জননী।
জ্বলজ্বলে তাজা স্বপ্ন রক্ত বমনের মত
উত্তাপিত কণ্ঠস্বরে বৃথা শুধু ঝরে।
শত্রুর শঠকাচক্রে বিশ্বেসকে করে বলাৎকার
মিথ্যে দেবতার স্তবে হৃদয়ের উজ্জ্বল কুসুম
ছিড়ে খুঁড়ে অর্ঘ্য দিয়ে— ঘরে এসে
নিরুত্তাপ নারীর শরীর জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকে।

এইসব মানুষেরা পথে পথে ভাসন্ত শ্যাওলা
জীবনের খরস্রোতে নেহায়েত খড়কুটো মানবিক বন্ধনবিহীন
মরুতে উদ্যানকুঞ্জ ছায়াময় ধর পাবে কই?
ঘর— সে তো অতীতের সুখস্বর্গ স্মৃতি, কদলী তরুর ঝোপ
নারকোলের হেলে পড়া ছায়া, আম কাঁঠালের বনে
নবীন ফাল্গুনে জাগা কচি কচি পল্লবের মায়া
কাকচক্ষু সরোবর মুগ্ধ চোখে আকাশ নেহারে
নদীর বঙ্কিম ধারা, বাছুরের হাম্বারব
হেমন্তে মাঠের বুকে সোনারঙ্গ ধানের জোয়ার।
নির্বাক মৃত্তিকাতলে নিরবিলি নিদ্রা যায়
উর্দ্ধতন চতুর্দশ পুরুষের প্রাণ, রত্নের ভাণ্ডার যেন
কোলে করে শুয়ে আছে দীনহীন সরল কবর।
ঘর নেই, তবুও ঘরের মায়া প্রাণে বিঁধে আছে সর্বক্ষণ
স্বপ্নে শোনে পিতৃপুরুষের স্বর, শোনে দেয়ার গর্জন
নদীর ছলছল স্রোত চোখে ভাসে, নতুন ধানের ঘ্রাণ
মগজের কোষে, সমীরিত মাঠ জাগে মনে
রক্তের স্পন্দনে বাজে বৃষ্টির ঝঙ্কার।
শহরের ফাঁকামাঠে বাঁশে কাঠে গড়ে তারা
ঘর নয়, ঘরের বিদ্রূপ — হাওয়ার দাপটে কাঁপে
এলোকেশী বৈশাখের ঝরে ছত্রখান, মাঘের দীঘল রাতে
হিমেল ভালুক ঢুকে বিঁধায় নখর
উদ্বাস্তু গ্রামের লোক বেআব্রু জীবন
বেঁধে রাখে যেইখানে অতিকষ্টে মনে করে ঘর।

ধীরে ধীরে পেকে উঠে আসন্ন সময়, একদিন
বস্তিবাসী মানুষের চোখে টুটে ঘুম, অলক্ষে ওপর হতে
জরুরী হুকুম নেমে এল, হঠাৎ জঞ্জাল সব রাবিশের স্তুপ
নগরী নিশ্চিত হোক, চাঁদের কলার মত বাড়ুক লাবণী।
কেননা সংবাদ গেছে এইসব বস্তির মজুর
ফিরিঅলা মিস্তিবাহাদুর একজোটে ফন্দি আঁটে
প্রথম সুযোগে নাকি বিস্ফোরণে ফাটাবে শহর;
নীল আসমানের থেকে অগ্নিময় বজ্র টেনে
নিষ্ঠুর নগর বক্ষে ঢালবে কহর। গ্রাম খারিজের
শোধ নেবে, সোনালী শস্যের নামে লাগাবে তাণ্ডব
বইয়ে দেবে রক্ত নদী, লালে লাল হবে রাজপথ
ক্ষেপা তরঙ্গের মত সহিংস আঘাতে
খুলে নেবে সভ্যতার ফ্যাকাশে বঙ্কল।
পাড়ায় পাড়ায় চলে প্রদীপ্ত মহড়া, কারা নাকি
নীল-নকশা লেখে, ঘুটঘুটে অন্ধকারে
শোণিতের মত লাল ফুটন্ত সকাল কারা নাকি
টেনে আনে, অমর আশার তরুহিম্মতে
রোপন করে বজ্রাহত হৃদয়ের তলে,আঁটে ছল।
অগুণতি মেষের শিশু নখে-দন্তে হয়ে ওঠে খল
কি জানি কখন, তরুণ সিংহের মত একসঙ্গে করে বসে প্রচণ্ড গর্জন।

চারিদিকে চাপা ভয়, বাতাসে ব্যাকুল ঝরে
তুমুল রটনা, এই বুঝি প্রকম্পনে ফেটে গেল শিলা
মাটির জমাট কান্না মুক্তি পেয়ে হয়ে গেল
বীর্যবান জীবন সঙ্গীত
ঝাঁঝরা বুকের তলে হৃতপিণ্ড বাজে এযন জঙ্গের দামামা।
ইত্যাকার বার্তা শুনে বুলডোজারেরা এল
নরম মাটির বুকে এঁকে দিল সুগভীর দাগ
ক্ষুদ্ধ রুষ্ট লোহার গণ্ডার, ঘুমভাঙ্গা কুম্ভকর্ণ
অন্ধরাগ নির্মম হিংসায় ছোটে ছোটে স্নেহনীড়ে
তুলে দিল ক্ষমতার ভার
দলামোচা হযে ভাঙে ঘরহার মানুষের ঘর।

অস্থিচর্মসার ন্যাংটো কালো কৌতুহলী শিশু
দেখল অবাক চোখে মানুষের আরো এক লুকানো স্বরূপ
মারনাস্ত্রে তাক করা কালো কালো চোখ
লাজুক পাখির তুল্য নির্বাক রমণী
নিষ্প্রাণ চিত্রের মত নিথরে দাড়িয়ে আছে, জানে না
শুকালো কবে অশ্রু উৎসে পানি।
বুড়োরা ঠোটের ফাঁকে বিড়বিড় করে উচ্চারণ
খণ্ডাতে পারে না কেউ ললাট লিখন।
অধোমুখে অপরাধী যুবাদের দল নির্বিকার সহ্য করে
বড় ব্যথা, যেন জীবন্ত ছাগল থেকে তুলে নেয় খাল।
বস্তির কুটুম সেই নির্লজ্জ কুকুর
মোটা তাজা হাড় ফেলে ঘুরে ঘুরে জুড়েছে চিৎকার।
শালিক ব্যথিত অতি ভুলে গেছে কথা
সুঠাম শিমুল তরু প্রসারিত ছায়া মেলে করে আছে চুপ
আবেগে কুসুমাদল লাল অশ্রুকণা হয়ে ঝরে।
কাঁথা-বালশের স্তুপ, হাড়ি কুড়ঘরের ভেজানো ঝাপ
খাঁচায় পোষিত পাখি, বাসন-কোসন
বালতি-মগ-হ্যারিকেন, সন্ধের চেরাগবাতি
আকাশে চক্কর দেয়া ডোরা-কাটা শান্ত কবুতর
দিশেহারা দুগ্ধবতী ছাগল জননী
দুঃখী মানুষের দুঃখে তোলে আর্তধ্বনি।

বাসাভাঙা পাখি প্রায় তাড়াখাওয়া প্রামীণ মানুষ
কুয়াশার পথ বেয়ে কোন্ দিকে যায়?
কম্পিত চরণ পাতে কোন্ কথা লিখে রাখে পাথুরে রাস্তায়?
জাগ্রত হৃতপিণ্ডতলৈ বিদ্যুৎ চমকে
সর্বহারা হৃদয়ের অগ্নিগর্ভ বাণী
হাড়ে হাড়ে বহ্নিমান কথার ফোয়ারা
সমাচ্ছন্ন অন্ধকারে কি আবেগে ফেটে পড়ে।
মমতার লেশহীন গর্বময়ী নিষ্ঠুর শহর
ক্ষমতার ক্রীড়াক্ষেত্র অবশ্য তোমাকে দেব
দরিদ্রকে ছলনার বর, আমরা যাব না গ্রামে
শিশু কি কখনো যায় মাতৃজরায়ণে?
দলিত মথিত হব হাড়ে হাড়ে পিষ্ট হব
বিষাক্ত ভীমরুল প্রায় গুপ্তঘরে
সারারাত করে রবো চুপ।
রজনী প্রভাতকালে বহির্গত হব সব
যেন ঝাঁক ঝাঁক বোমারু বিমান।
হে শহর গর্বোদ্ধত নিষ্ঠুর শহর
তোমার সঙ্কীর্ণ বক্ষে সবান্ধবে একদিন
ঢেলে দেব মারাত্নক আজব কহর
গ্রাম খারিজের শোধ নেব, সোনালী শস্যের
নামে লাগাব তাণ্ডব, বইয়ে দেব রক্তনদী
লালে লাল হবে রাজপথ, ক্ষেপাতরঙ্গের মত সহিংস আঘাতে
খুলে নেব সভ্যতার বঙ্কল।

ব্যথা দাও, বুকে রাখবো

-রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্

ব্যথা দাও,বুকে রাখবো
ব্যথার জন্যই তো হৃদয়
আঘাতে বুক ভাঙবে না
বুকে ব্যথা আছে।

গলিত লাভাগুলো বেদনার
যেন ঘনীভূত পাথরের দেহ
আঘাতে পাথর কখনো গলে না
গলে না হৃদয়।

পাহাড়ে ধস নামলে কখনো
মাটি অনায়াসে পেতে দেয় বুক।
তুমি যাবতীয় দুঃখকে ছুঁড়ে দাও
আমি বুক পেতে নেবো
বুক ভাঙবে না।

দুয়ার বন্ধ করলেই
আমি ফিরে যাবো নির্বিকার,
অস্বীকার করো মেনে নেবো।

এলবামে স্মৃতি নেই বলে
আদৌ দুঃখ করি না,
সোনালি নিসঙ্গতায় আমার
বিচিত্র দুঃখের সমাবেশ সঞ্চয় – ।

ব্যথা দাও,বুকে রাখবো
ব্যথায় ভাঙবে না বুক
বুকে ব্যথা আছে ।

বড়লোক গরিবলোক

সুবোধ সরকার

বড়লোক কখনও ভোরের আলো দেখতে পায় না
গরিব তেমনি "সুপ্রভাত" বলে না কাউকে ।
বড়লোকের মেয়েরা গায়ে রোদ লাগাতে মরিশাস যায়
গরিবের উঠোন রোদে পুড়ে নৌকো হয়ে থাকে ।

বড়লোকেরা রাত বারোটার আগে ঘুমোতে পারে না
খালি পেটে ছোটলোকেরা ঘুমিয়ে পড়ে সন্ধে সাতটায় ।

ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে খালি পেটের ভেতর একটা বস্তি
ভরা পেটের ভেতর একটা চোদ্দোতলা বাড়ি ।

বস্তি বলছে চোদ্দোতলাকে, তুই ভেঙে পড়, তোর দরজা খুলে বস্তিতে লাগাব
চোদ্দোতলা বলছে, "তুই পুড়ে যা, তোর উপর চোদ্দোতলা তুলবো" ।

বঙ্গভূমি

অক্ষয় কুমার বড়াল

প্রণামি তোমারে আমি, সাগর-উত্থিতে,
      ষড়ৈশ্বর্যময়ী, অয়ী জননী আমার!
তোমার শ্রীপদ-রজঃ এখনো লভিতে
      প্রসারিছে করপুট ক্ষুব্ ধ পারাবার |
শত শৃঙ্গ-বাহু তুলি হিমাদ্রি-শিয়রে
      করিছেন আশির্বাদ      স্হির নেত্রে চাহি ;
শুভ্র মেঘ-জটাজাল ছলে বায়ুভরে,
      স্নেহ-অশ্রু শতধারে ঝরে বক্ষ বাহি |
জ্বলিছে কিরিট তব       নিদাঘ-তপন
      ছুটিতেছে দিকে-দিকে দীপ্ত রশ্মি-শিখা ;
জ্বলিয়া-জ্বলিয়া উঠে শুষ্ক কাশবন,
      নদীটত-বালুকায় সুবর্ণ-কণিকা |

মূর্তিমতী হয়ে সতী, এসো ঘরে-ঘরে
      রাখো ক্ষুদ্র কপর্দকে রাঙা পা দুখানি!
ধান্য-শীর্ষ স্বর্ণ-ঝাঁপি লও রাঙা করে
      ভুলে যাই       সর্ব দৈন্য, সর্ব দুঃখ গ্লানি!

বৃষ্টি

রফিক আজাদ

খররৌদ্রময় এই দিন—
শ্যামল বাংলায় বুঝি ফের নেমে আসে খরা!
খরতাপে রুদ্ধশ্বাসক্ষুদ্র এই গ্রামীণ শহর,
এ রকম এই দিনে চেতনায়ও খরার প্রদাহ—
নির্বাচনে হেরে-যাওয়া প্রার্থী যেন: বিরক্ত, বিব্রত;
এ রকম দুঃসময়ে এল বৃষ্টির শব্দের মতো
সুখকর এই পত্র—প্রাগের প্রাচীর থেকে উড়ে!
কুপিত, বিব্রতকর এই রোদে খামটি খুলিনি;
আমি তো অপেক্ষা জানি: এই খররৌদ্রে কখনো কি
প্রিয় বান্ধবীর লেখা চিঠি খোলা চলে?
অতএব, রেখে দিই যত্ন করে নিজস্ব ড্রয়ারে!
১১ জুলাই রাতে অকস্মাৎ বৃষ্টি নেমে এল
যেন দীর্ঘদিন পর হঠাৎ হারিয়ে-যাওয়া আমার সন্তান
ঘরে ফিরে এল।
বাইরে এখন বৃষ্টি,
বৃষ্টির স্নিগ্ধতা বহু দিন পর যেন
আমার হূদয়ে প্রীত মধ্যযুগ ভরে দিয়ে গেল!

এখনো বাইরে বৃষ্টি: জানালায় জলের প্রপাত—
এই বুঝি প্রকৃষ্ট সময় যখন প্রশান্ত মন,
হূদয়ে যখন আর খেদ নেই কোনো, ভারাতুর
নয় আর মন, ক্রোধ নেই, ঘৃণা নেই—অবিশ্বাস্য
শান্তিপ্রিয় আজ এই মাঞ্চুরীয় রাখাল বালক;
হূদয়ে কোনোই শোক নেই—শোকানুভূতিও নেই—
অসম্ভব শান্ত আজ—সমাহিত—আমার হূদয়!
নষ্ট করে ফেলে-দেয়া জীবনের জন্য নেই কোনো
শোচনা ও তাপ;—বৃষ্টির সৌগন্ধে ভরে আছে মন!
মনে হচ্ছে আমার মতন সুখী কেউ নেই আর
পৃথিবীর কোনো প্রান্তে ১১ জুলাই এই রাতে!

২.
এখন আপনার চিঠি খোলা যায় এই পরিবেশে:
এ কী করেছেন! খামে ভরে কেউ কারুকে পাঠায়
গোবি-সাহারার দীর্ঘ হাহাকার, চীনের প্রাচীর?
স্তব্ধ হয়ে থাকি চিঠি পড়ে: সারাটা দুনিয়া জুড়ে
মানুষের এত দুঃখ—এর থেকে পরিত্রাণ নেই?
—বৃষ্টির প্রপাত শুনে, গাছের সবুজে চোখ রেখে
শিশুদের গালে চুমো খেয়ে আমরা পারি না ফের
এই দুঃখী গ্রহটির অন্তর্গত অসুখ সারাতে?

বৃষ্টি

অমিয় চক্রবর্তী

কেঁদেও পাবে না তাকে বর্ষার অজস্র জলধারে।

ফাল্গুন বিকেলে বৃষ্টি নামে।
শহরের পথে দ্রুত অন্ধকার।
লুটোয় পাথরে জল, হাওয়া তমস্বিনী;
আকাশে বিদ্যুৎজ্বলা বর্শা হানে
ইন্দ্রমেঘ;
কালো দিন গলির রাস্তায়।
কেঁদেও পাবে না তাকে অজস্র বর্ষার জলধারে।

নিবিষ্ট ক্রান্তির স্বর ঝরঝর বুকে
অবারিত।
চকিত গলির প্রান্তে লাল আভা দুরন্ত সিঁদুরে
পরায় মূহুর্ত টিপ,
নিভে যায় চোখে
কম্পিত নগরশীর্ষে বাড়ির জটিল বোবা রেখা।
বিরাম স্তম্ভিত লগ্ন ভেঙে
আবার ঘনায় জল।
বলে নাম, বলে নাম, অবিশ্রাম ঘুরে-ঘুরে হাওয়া
খুঁজেও পাবে না যাকে বর্ষায় অজস্র জলধারে।

আদিম বর্ষণ জল, হাওয়া, পৃথিবীর।
মত্ত দিন, মুগ্ধ ক্ষণ, প্রথম ঝঙ্কার
অবিরহ,
সেই সৃষ্টিক্ষণ
স্রোত:স্বনা
মৃত্তিকার সত্তা স্মৃতিহীনা
প্রশস্ত প্রচীর নামে নিবিড় সন্ধ্যায়,
এক আর্দ্র চৈতন্যের স্তব্ধ তটে।

ভেসে মুছে ধুয়ে ঢাকা সৃষ্টির আকাশে দৃষ্টিলোক।
কী বিহ্বল মাটি গাছ, দাঁড়ানো মানুষ দরজায়
গুহার আঁধারে চিত্র , ঝড়ে উতরোল
বারে-বারে পাওয়া, হাওয়া, হারানো নিরন্ত ফিরে-ফিরে-
ঘনমেঘলীন
কেঁদেও পাবে না যাকে বর্ষায় অজস্র জলধারে।

বসন্তে

কুসুমকুমারী দাশ

[ব্রহ্মবাদী, ফাল্গুন ও চৈত্র ১৩২৭]

উত্সব গান, মধুময় তান
         আকাশ ধরণী-তলে
কুঞ্জে কুঞ্জে বিহগ কণ্ঠে
         লতায় পাতায় ফুলে |
হৃদয়ে সবার দিয়েছে রে দোল
         নাচিয়া উঠিছে প্রাণ,
(এ যে) নূতন দেশের মোহন ঝঙ্কার
         নূতন দেশের গান |
এ বসন্ত কার, দিতেছে বাহার
         চেতনার ঢেউ খুলি
কেবা আপনার, কেবা পর আর
         ব্যবধান গেছে খুলি
আজ সে এসেছে দেবদূত হয়ে
         জাগাতে সহস্র প্রাণ,
কে আসিবি আয়, ওই শোনা যায়
         আনন্দময়ের গান |
কে বাঁচিবি আয়, বাতাসে বাতাসে
         পরশে চেতনা জাগে ;
কে বাঁচিবি আয়, হৃদয়ে হৃদয়ে,
         আজি নব অনুরাগে |

বন্দনা

কুসুমকুমারী দাশ

[ব্রহ্মবাদী, ভাদ্র ও আশ্বিন, ১৩০৮]

বিশ্ব আঁধার ভেদিয়া করে বন্দনা
          নবীন রক্ত তপন মহান আলোকে |
গরজি গভীর স্বননে ধায় পারাবার
          চুমিতে চরণতল অতুল পুলকে!
বনে উপবনে ফোটে কত ফুল
          শিশিরসিক্ত নব-লাবণ্যে ভরিয়া
পরিমল শোভা সকলি বিকশি উঠে
          তব মধুর পরশ লাগিয়া
দিগ্ দিগন্তে চুমিয়া বহে সমীরণ
          কাহারে খুঁজিছে সে দিশেহারা ?
শান্ত উদার গগনে, অযুত অযুত তারকা
          কৌতুকভরে নেহারে কাহারে তারা ?
কুলকুলু নাদে তটিনী ছুটিছে
          তার বক্ষে বিপুল বাসনা
প্রেম-পাগল হিয়াখানি আজি
          ওই চরণে করিবে লগনা |
গীতগন্ধ ছন্দোময় বিশ্ব
          কত বন্দন পাঠায় তোমারি কাছে |
ওগো গম্ভীর, ওগো সুন্দর, ভূবনবাঞ্ছিত
          কি দিবে দীন, শুধু করুণা যাচে |

বাঙলা ভাষা

হুমায়ুন আজাদ

শেকলে বাঁধা শ্যামল রূপসী, তুমি-আমি, দুর্বিনীত দাসদাসী-
একই শেকলে বাঁধা প’ড়ে আছি শতাব্দীর পর শতাব্দী।
আমাদের ঘিরে শাঁইশাঁই চাবুকের শব্দ, স্তরে স্তরে শেকলের ঝংকার।
তুমি আর আমি সে-গোত্রের যারা চিরদিন উৎপীড়নের মধ্যে গান গায়-
হাহাকার রূপান্তরিত হয় সঙ্গীতে-শোভায়।

লকলকে চাবুকের আক্রোশ আর অজগরের মতো অন্ধ শেকলের
মুখোমুখি আমরা তুলে ধরি আমাদের উদ্ধত দর্পিত সৌন্দর্য:
আদিম ঝরনার মতো অজস্র ধারায় ফিনকি দেয়া টকটকে লাল রক্ত,
চাবুকের থাবায় সুর্যের টুকরোর মতো ছেঁড়া মাংস
আর আকাশের দিকে হাতুড়ির মতো উদ্যত মুষ্টি।

শাঁইশাঁই চাবুকে আমার মিশ্র মাংসপেশি পাথরের চেয়ে শক্ত হয়ে ওঠে
তুমি হয়ে ওঠো তপ্ত কাঞ্চনের চেয়েও সুন্দর।
সভ্যতার সমস্ত শিল্পকলার চেয়ে রহস্যময় তোমার দু-চোখ
যেখানে তাকাও সেখানেই ফুটে ওঠে কুমুদকহ্লার
হরিণের দ্রুত ধাবমান গতির চেয়ে সুন্দর ওই ভ্রূযুগল
তোমার পিঠে চাবুকের দাগ চুনির জড়োয়ার চেয়েও দামি আর রঙিন
তোমার দুই স্তন ঘিরে ঘাতকের কামড়ের দাগ মুক্তোমালার চেয়েও ঝলোমলো
তোমার ‘অ, আ’ –চিৎকার সমস্ত আর্যশ্লোকের চেয়েও পবিত্র অজর

তোমার দীর্ঘশ্বাসের নাম চন্ডীদাস
শতাব্দী কাঁপানো উল্লাসের নাম মধুসূদন
তোমার থরোথরো প্রেমের নাম রবীন্দ্রনাথ
বিজন অশ্রুবিন্দুর নাম জীবনানন্দ
তোমার বিদ্রোহের নাম নজরুল ইসলাম

শাঁইশাঁই চাবুকের আক্রোশে যখন তুমি আর আমি
আকাশের দিকে ছুঁড়ি আমাদের উদ্ধত সুন্দর বাহু, রক্তাক্ত আঙুল,
তখনি সৃষ্টি হয় নাচের নতুন মুদ্রা;
ফিনকি দেয়া লাল রক্ত সমস্ত শরীরে মেখে যখন আমরা গড়িয়ে পড়ি
ধূসর মাটিতে এবং আবার দাঁড়াই পৃথিবীর সমস্ত চাবুকের মুখোমুখি,
তখনি জন্ম নেয় অভাবিত সৌন্দর্যমন্ডিত বিশুদ্ধ নাচ;
এবং যখন শেকলের পর শেকল চুরমার ক’রে ঝনঝন ক’রে বেজে উঠি
আমরা দুজন, তখনি প্রথম জন্মে গভীর-ব্যাপক-শিল্পসম্মত ঐকতান-
আমাদের আদিগন্ত আর্তনাদ বিশশতকের দ্বিতীয়ার্ধের
একমাত্র গান।

বড়োবাবুর কাছে নিবেদন

অমিয় চক্রবর্তী

তালিকা প্রস্তুত
কী কী কেড়ে নিতে পারবে না-
হই না নির্বাসিত-কেরানি।
বাস্তুভিটে পৃথিবীটার সাধারণ অস্তিত্ব।
যার এক খন্ড এই ক্ষুদ্র চাকরের আমিত্ব।
যতদিন বাঁচি, ভোরের আকাশে চোখ জাগানো,
হাওয়া উঠলে হাওয়া মুখে লাগানো।
কুয়োর ঠান্ডা জল, গানের কান, বইয়ের দৃষ্টি
গ্রীষ্মের দুপুরে বৃষ্টি।
আপন জনকে ভালোবাসা,
বাংলার স্মৃতিদীর্ণ বাড়ি-ফেরার আশা।

তাড়াও সংসার, রাখলাম,
বুকে ঢাকলাম
জন্মজন্মান্তরের তৃপ্তি যার যোগ প্রাচীন গাছের ছায়ায়
তুলসী-মন্ডপে, নদীর পোড়ো দেউলে, আপন ভাষার কন্ঠের মায়ায়।
থার্ডক্লাসের ট্রেনে যেতে জানলায় চাওয়া,
ধানের মাড়াই, কলা গাছ, কুকুর, খিড়কি-পথ ঘাসে ছাওয়া।
মেঘ করেছে, দু-পাশে ডোবা, সবুজ পানার ডোবা,
সুন্দরফুল কচুরিপানার শঙ্কিত শোভা,
গঙ্গার ভরা জল; ছোটো নদী; গাঁয়ের নিমছায়াতীর-
হায়, এও তো ফেরা-ট্রেনের কথা।
শত শতাব্দীর
তরু বনশ্রী
নির্জন মনশ্রী :
তোমায় শোনাই, উপস্থিত ফর্দে আরো আছে-
দূর-সংসারে এলো কাছে
বাঁচবার সার্থকতা।।

বহিরাগত


শঙ্খ ঘোষ

আমার কথা কি বলতে চাও না? নিশ্চিত তুমি বহিরাগত |
উঁচু স্বর তুলে কথা বলে যারা জেনে নাও তারা বহিরাগত |
গাঁয়ে কোণে কোণে গাঁয়ের মানুষ খেতে বা খামারে বহিরাগত |
মরা মানুষের মুখাচ্ছাদন সরিয়ো না, ও তো বহিরাগত |
মাঠে মাঠে ধরে যেটুকু ফসল সেসবও এখন বহিরাগত |
চালার উপরে ঝুঁকে পড়ে চাঁদ বহুদূর থেকে বহিরাগত |
বর্ষাফলকে বিষ মেখে নিয়ে কালো মুখোশের আড়ালে যত
বহিরাগতরা এসে ঠিক ঠিকই বুঝে নেয় কারা বহিরাহত |

বিদায়ের শেষ চুম্বন

কায়কোবাদ

( ১ )
আবার, আবার সেই বিদায়-চুম্বন,
আলেয়ার আলো প্রায়,
আঁধারে ডুবায়ে যায়,
স্মৃতিটি রাখিয়া হায় করিতে দাহন!

( ২ )
বিদায়-চুম্বন,
উভয়েরি প্রাণে করে অগ্নি বরিষণ,
উভয়ে উভয় তরে,
আকুলি ব্যাকুলি করে,
উভয়েরি হৃদিস্তরে যাতনা-ভীষণ!
এমনি কঠোর হায় বিদায়-চুম্বন!

( ৩ )
প্রণয়ের মধুমাখা প্রথম চুম্বনে,
শুধু সুখ সমুল্লাস ;
এতে ঘন হাহুতাশ,
কেবলি যে বহে হায় উভয়েরি মনে!

( ৪ )
সে চুম্বনে এ চুম্বনে কি দিব তুলনা,
সে স্বর্গের পরিমল,
এ মর্তের হলাহল,
তাহাতে উল্লাস, এতে কেবলি যাতনা!

( ৫ )
সে যে শরতের স্নিগ্ধ সুধাংশু-কিরণ,
মুহুর্তে মাতায় ধরা,
এ যে শুধু ক্লেশ ভরা
বৈশাখের ঘন ঘোর ঝটিকা ভীষণ!

বোঝাপড়া

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

      মনেরে আজ কহ যে ,
ভালো মন্দ যাহাই আসুক
      সত্যেরে লও সহজে ।
কেউ বা তোমায় ভালোবাসে
      কেউ বা বাসতে পারে না যে ,
কেউ বিকিয়ে আছে , কেউ বা
      সিকি পয়সা ধারে না যে ,
কতকটা যে স্বভাব তাদের
      কতকটা বা তোমারো ভাই ,
কতকটা এ ভবের গতিক—
      সবার তরে নহে সবাই ।
তোমায় কতক ফাঁকি দেবে
      তুমিও কতক দেবে ফাঁকি ,
তোমার ভোগে কতক পড়বে
      পরের ভোগে থাকবে বাকি ,
মান্ধাতারই আমল থেকে
      চলে আসছে এমনি রকম—
তোমারি কি এমন ভাগ্য
      বাঁচিয়ে যাবে সকল জখম !
            মনেরে আজ কহ যে ,
      ভালো মন্দ যাহাই আসুক
            সত্যেরে লও সহজে ।

অনেক ঝঞ্ঝা কাটিয়ে বুঝি
      এলে সুখের বন্দরেতে ,
জলের তলে পাহাড় ছিল
      লাগল বুকের অন্দরেতে ,
মুহূর্তেকে পাঁজরগুলো
      উঠল কেঁপে আর্তরবে—
তাই নিয়ে কি সবার সঙ্গে
      ঝগড়া করে মরতে হবে ?
ভেসে থাকতে পার যদি
      সেইটে সবার চেয়ে শ্রেয় ,
না পার তো বিনা বাক্যে
      টুপ করিয়া ডুবে যেয়ো ।
এটা কিছু অপূর্ব নয় ,
      ঘটনা সামান্য খুবই—
শঙ্কা যেথায় করে না কেউ
      সেইখানে হয় জাহাজ - ডুবি ।
            মনেরে তাই কহ যে ,
      ভালো মন্দ যাহাই আসুক
            সত্যেরে লও সহজে ।

তোমার মাপে হয় নি সবাই
      তুমিও হও নি সবার মাপে ,
তুমি মর কারো ঠেলায়
      কেউ বা মরে তোমার চাপে—
তবু ভেবে দেখতে গেলে
      এমনি কিসের টানাটানি ?
তেমন করে হাত বাড়ালে
      সুখ পাওয়া যায় অনেকখানি ।
আকাশ তবু সুনীল থাকে ,
      মধুর ঠেকে ভোরের আলো ,
মরণ এলে হঠাৎ দেখি
      মরার চেয়ে বাঁচাই ভালো ।
যাহার লাগি চক্ষু বুজে
      বহিয়ে দিলাম অশ্রুসাগর
তাহারে বাদ দিয়েও দেখি
      বিশ্বভুবন মস্ত ডাগর ।
            মনেরে তাই কহ যে ,
      ভালো মন্দ যাহাই আসুক
            সত্যেরে লও সহজে ।

নিজের ছায়া মস্ত করে
      অস্তাচলে বসে বসে
আঁধার করে তোল যদি
      জীবনখানা নিজের দোষে ,
বিধির সঙ্গে বিবাদ করে
      নিজের পায়েই কুড়ুল মার ,
দোহাই তবে এ কার্যটা
      যত শীঘ্র পার সারো ।
খুব খানিকটে কেঁদে কেটে
      অশ্রু ঢেলে ঘড়া ঘড়া
মনের সঙ্গে এক রকমে
      করে নে ভাই , বোঝাপড়া ।
তাহার পরে আঁধার ঘরে
      প্রদীপখানি জ্বালিয়ে তোলো—
ভুলে যা ভাই , কাহার সঙ্গে
      কতটুকুন তফাত হল ।
            মনেরে তাই কহ যে ,
      ভালো মন্দ যাহাই আসুক
            সত্যেরে লও সহজে ।

বিংশ শতাব্দী

নাজিম হিকমত

' চলো ঘুমোতে যাই, প্রিয় আমার,
ওঠা যাবে আবার একশো বছর পরে।…'

না,
আমি বেইমান নই,
এ শতাব্দী আমার বিভীষিকা নয়।
ছন্নছাড়া আমার শতাব্দী
লজ্জায় আরক্তিম
দৃপ্ত আমার এই শতাব্দী
মহামহিমান্বিত
রথী।

বড় বেশি আগে জন্মেছি ব’লে কখনও বিলাপ করিনি,
আমি বিংশ শতাব্দীর মানুষ।
আমার গর্ব
আমি আছি।
আমার দেশের মানুষের মাঝখানে
নতুন পৃথিবীর মুখ চেয়ে আমি লড়ছি
আবার কী চাই…’

‘একশো বছর পরে, প্রিয় আমার…
‘না, বেশি দেরি নেই
সব কিছু সত্ত্বেও
আমার শতাব্দী প্রতি মুহূর্তে মরে গিয়ে
আবার নতুন জন্ম নিচ্ছে
আমার শতাব্দীর শেষের দিনগুলো বড় সুন্দর হবে
সূর্যলোকে ঠিকরে পড়বে আমার শতাব্দী, আমার প্রিয়,
ঠিক তোমার চোখের মত।’

বিদায়

অনঙ্গমোহিনী দেবী

চিরতরে চলে গেছে হৃদয়ের রাজ,
অতল বিষাদে মোরে ডুবাইয়ে আজ!
নিয়ে গেছে সুখ সাধ সুখের বাসনা,
রেখে গেছে জন্ম শোধ হৃদয় বেদনা!
সে মম পুষ্পিত শুভ্র বসন্ত জীবন,
গেছে যবে, সাথে গেছে আমার ভূবন!
নিশীথের সুখময় জোছনা মগন,
মধ্যাহ্নের আলোময় উজ্জ্বল গগন ;
প্রভাতের মৃদু মন্দ মলয় বাতাস,
ধূসর রক্তিম চারু সন্ধ্যার আকাশ ;
কুসুমিত সুবাসিত নিকুঞ্জ কানন,
ভ্রমর গুঞ্জিত সদা সুখের সদন!
এ সকলি গেছে চলে তারি সাথে সাথে
এবে নিশা দেখা দেয় জীবন-প্রভাতে!
নিবে গেছে জীবনের শুভ্র দীপ্তি আলো,
প্রাণে শুধু নেমে আসে ঘোর ছায়া কালো!
গিয়েছে সকলি মম কিছু নাহি আর,
রয়েছে কেবল স্মৃতি আর অশ্রুধার!

ব্যাং

বুদ্ধদেব বসু

বর্ষায় ব্যাঙের ফুর্তি | বৃষ্টি শেষ, আকাশ নির্বাক ;
উচ্চকিত ঐকতানে শোনা গেল ব্যাঙেদের ডাক |

আদিম উল্লাসে বাজে উন্মুক্ত কণ্ঠের উচ্চ সুর |
আজ কোনো ভয় নেই-- বিচ্ছেদের, ক্ষুধার মৃত্যুর |

ঘাস হ'ল ঘন মেঘ ; স্বচ্ছ জল জ'মে আছে মাঠে
উদ্ধত আনন্দগানে উত্সবের দ্বিপ্রহর কাটে |

স্পর্ষময় বর্ষা এল ; কী মসৃণ তরুণ কর্দম !
স্ফীতকণ্ঠ, বীতস্কন্ধ-- সংগীতের শরীরী সপ্তম |

আহা কী চিক্কণ কান্তি মেঘস্নিগ্ধ হলুদে-সবুজে !
কাচ-স্বচ্ছ উর্ধ্ব দৃষ্টি চক্ষু যেন ঈশ্বরের খোঁজে

ধ্যানমগ্ন ঋষি-সম | বৃষ্টি শেষ, বেলা প'ড়ে আসে ;
গম্ভীর বন্দনাগান বেজে ওঠে স্তম্ভিত আকাশে |

উচ্চকিত উচ্চ সুর ক্ষীণ হ'লো ; দিন মরে ধুঁকে ;
অন্ধকার শতচ্ছিদ্র একচ্ছন্দা তন্দ্রা-আনা ডাকে |

মধ্যরাত্রে রুদ্ধদ্বার আমরা আরামে শয্যাশায়ী,
স্তব্ ধ পৃথিবীতে শুধু শোনা যায় একাকী উত্সাহী

একটি অক্লান্ত সুর ; নিগূড় মন্ত্রের শেষ শ্লোক --
নিঃসঙ্গ ব্যাঙের কণ্ঠে উত্সারিত -- ক্রোক, ক্রোক, ক্রোক |

বারবার ফিরে আসে

শামসুর রাহমান

বার বার ফিরে আসে রক্তাপ্লুত শার্ট
ময়দানে ফিরে আসে, ব্যাপক নিসর্গে ফিরে আসে,
ফিরে আসে থমথমে শহরের প্রকাণ্ড চোয়ালে।
হাওয়ায় হাওয়ায় ওড়ে, ঘোরে হাতে হাতে,
মিছিলে পতাকা হয় বারবার রক্তাপ্লুত শার্ট।
বিষম দামাল দিনগুলি ফিরে আসে বারবার,
বারবার কল্লোলিত আমাদের শহর ও গ্রাম।

‘আবার আসবো ফিরে’ ব’লে সজীব কিশোর
শার্টের আস্তিন দ্রুত গোটাতে গোটাতে
             শ্লোগানের নিভাঁজ উল্লাসে
বারবার মিশে যায় নতুন মিছিলে, ফেরে না যে আর।
একটি মায়ের চোখ থেকে
করুণ প্লাবন মুছে যেতে না যেতেই
আরেক মায়ের চোখ শ্রাবণের অঝোরে আকাশ হ’য়ে যায়।
একটি বধূর
সংসার উজাড়-করা হাহাকার থামতে না থামতেই, হায়,
আরেক বধূর বুক খাঁ-খাঁ গোরস্থান হ’য়ে যায়,
             ঝ’রে পড়তে না পড়তেই
আরেক পিতার বুক-শূন্য-করা গুলিবিদ্ধ সন্তানের লাশ
             নেমে যায় নীরন্ধ্র কবরে।

বারবার ফিরে আসে রক্তাপ্লুত শার্ট,
ময়দানে ফিরে আসে, ব্যাপক নিসর্গে ফিরে আসে,
ফিরে আসে থমথমে শহরের প্রকাণ্ড চোয়ালে।
উনিশ শো উনসত্তরের
তরুণ চীৎকৃত রৌদ্রে যে-ছেলেটা খেলতো রাস্তায়,
বানাতো ধুলোর দুর্গ, খেতো লুটোপুটি নর্দমার ধারে
বিস্ময়ে দেখতো চেয়ে ট্রাক, জীপ,
রাইফেল, টিউনিক, বেয়োনেট, বুট, হেলমেট,
এখন সে টলমল পদভরে শরীক মিছিলে।
লাজনম্র যে মেয়েটি থাকতো আড়ালে সর্বক্ষণ,
যে ছিল অসূর্যস্পশ্যা, এখন সে ঝলসায় মিছিলে মিছিলে।
তাদের পায়ের নিচে করে জ্বলজ্বল নীল নকশা নব্য সভ্যতার।

বারবার ফিরে আসে রক্তাপ্লুত শার্ট,
ময়দানে ফিরে আসে, ব্যাপক নিসর্গে ফিরে আসে,
ফিরে আসে থমথমে শহরের প্রকাণ্ড চোয়ালে।
হতাশাকে লাথি মেরে, ভয়কে বেদম লাঠি পেটা ক’রে
সবখানের শ্লোগানের ফুলকি ছড়াই।
বারবার আমাদের হাত হয় উদ্দাম নিশান,
বারবার ঝড়ক্ষুব্ধ পদ্মা হই আমরা সবাই।

আমাকেই হত্যা করে ওরা, বায়ান্নোর রৌদ্রময় পথে,
আমাকেই হত্যা করে ওরা
উনসত্তরের বিদ্রোহী প্রহরে,
একাত্তরে পুনরায় হত্যা করে ওরা আমাকেই
আমাকেই হত্যা করে ওরা
            পথের কিনারে
            এএভন্যুর মোড়ে
             মিছিলে, সভায়-
আমাকেই হত্যা করে, ওরা হত্যা করে বারবার।
তবে কি আমার
বাংলাদেশ শুধু এক সুবিশাল শহীদ মিনার হ’য়ে যাবে ?

বাইবেলের কালো অক্ষরগুলো

শামসুর রাহমান

জো, তুমি আমাকে চিনবে না। আমি তোমারই মতো
একজন কালো মানুষ গলার সবচেয়ে
উঁচু পর্দায় গাইছি সেতুবন্ধের গান, যে গানে
তোমার দিলখোলা সুরও লাগছে।

জো, যখন ওরা তোমার চামড়ায় জ্বালা-ধরানো
সপাং সপাং চাবুক মারে আর
হো হো করে হেসে ওঠে,
যখন ওরা বুটজুতোমোড়া পায়ে মারে তোমাকে,
তখন ধূলায় মুখ থুবড়ে পড়ে মানবতা।
জো, যখন ওরা তোমাকে
হাত পা বেঁধে নির্জন রাস্তায় গার্বেজ ক্যানের পাশে
ফেলে রাখে, তখন ক্ষ্যাপাটে অন্ধকারে
ভবিষ্যৎ কাতরাতে থাকে
গা’ ঝাড়া দিয়ে ওঠার জন্যে।
যদিও আমি তোমাকে কখনো দেখিনি জো,
তবু বাইবেলের কালো অক্ষরের মতো তোমার দুফোঁটা চোখ
তোমার বেদনার্ত মুখ বারংবার
ভেসে ওঠে আমার হৃদয়ে, তোমার বেদনা
এশিয়া, আফ্রিকা আর লাতিন আমেরিকায় ব্যাপ্ত, জো।

আমি একজন ফাঁসির আসামীকে জানতাম,
যিনি মধ্যরাতে আবৃত্তি করতেন রবীন্দ্রনাথের কবিতা।
আমি এক সুদর্শন যুবাকে জানতাম,
যে দয়িতার মান রাখার জন্যে জান কবুল করেছিলো
আমাদের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে,
আমি একজন যাবজ্জীবন কারাবন্দী তেজী
নেতাকে জানতাম, দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠে
যিনি কোনো কোনো রাতে তার শিশুকন্যাকে একটু
স্পর্শ করার জন্যে, ওর মাথার ঘ্রাণ নেয়ার জন্যে উদ্বেল আর
ব্যাকুল হয়ে আঁকড়ে ধরতেন
কারাগারের শিক।
আমি এমন এক তরুণের কথা জানতাম,
যে-তার কবিতায় আলালের ঘরের দুলাল, মেনিমুখো শব্দাবলি ঝেড়ে ফেলে
অপেক্ষা করতো সেদিনের জন্যে,
যেদিন তার কবিতা হবে মৌলানা ভাসানী
এবং শেখ মুজিবের সূর্যমুখী ভাষণের মতো।

যখন তাদের কথা মনে পড়ে,
তখন তোমার কথা নতুন করে ভাবি, জো।
জো, যখন তোমার পাঁচ বছরের ছেলের
বুক থেকে রাস্তায় ওরা ঝরায় টকটকে লাল রক্ত,
যেমন পিরিচে ঢেলে দ্যায় কফি,
জো, যখন তোমার পোয়াতি বউ হায়নাদের
দৃষ্টি থেকে পালানোর জন্যে দৌঁড়ুতে দৌঁড়ুতে
মাঝপথে হুমড়ি খেয়ে পড়ে,
জো, যখন তোমার সহোদরকে ওরা
লটকিয়ে দ্যায় ফাঁসিতে,
তখন কাঁচা দুধের ফেনার মতো ভোরের শাদা-আলোয়
বাইবেলের কালো অক্ষরগুলো আর্তনাদ করতে করতে
হঠাৎ বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।