—জসীমউদদীন
খেতের পরে খেত চলেছে, খেতের নাহি শেষ
সবুজ হাওয়ায় দুলছে ও কার এলো মাথার কেশ।
সেই কেশেতে গয়না ও পরায় প্রজাপতির ঝাঁক,
চঞ্চুতে জল ছিটায় সেথা কালো কালো কাক।
সাদা সাদা বক-কনেরা রচে সেথায় মালা,
শরৎকালের শিশির সেথা জ্বালায মানিক আলা।
তারি মায়ায় থোকা থোকা দোলে ধানের ছড়া,
মার আঁচলের পরশ যেন সকল অভাব-হরা।
সেই ফসলে আসমানীদের নেইকো অধিকার,
জীর্ণ পাঁজর বুকের হাড়ে জ্বলছে হাহাকার।
বনের পরে বন চলেছে বনের নাহি শেষ,
ফুলের ফলের সুবাস ভরা এ কোন্ পরীর দেশ?
নিবিড় ছায়ায় আঁধার করা পাতার পারাবার,
রবির আলো খন্ড হয়ে নাচছে পায়ে তার।
সুবাস ফুলের বুনোট করা বনের লিপিখানি,
ডালের থেকে ডালের পরে ফিরছে পাখি টানি।
কচি কচি বনের পাতা কাঁপছে তারি সুরে,
ছোট ছোট রোদের গুড়ো তলায় নাচে ঘুরে,
মাথার পরে কালো কালো মেঘেরা এসে ভেড়ে
বুনো হাতীর দল এসেছে আকাশখানি ছেড়ে।
এই বনেতে আসমানীদের নেইকো অধিকার,
জীর্ণ পাঁজর বুকের হাড়ে জ্বলছে অনাহার।
নদীর পরে নদী গেছে নদীর নাহি শেষ,
কত অজান গাঁ পেরিয়ে কত না-জান দেশ।
সাত সাগরের পণ্য চলে সওদাগরের নায়,
সুধার ধারা গড়িয়ে পড়ে গঞ্জ নগর ছায়।
চখায় মুকর বালুর চরা হাসে কতই তীরে,
ফুলের বনে রঙিন হয়ে যায় বা কভু ধীরে;
কত মিনার-সৌধ চূড়ার কোল ঘেঁষিয়া যায়,
কত শহর হাট-বন্দর বাজার ফেলে বায়।
কত নায়ের ভাটিয়ালীর গানে উদাস হয়ে,
নদীর পরে নদী চলে কোন অজানায বয়ে।
সেই নদীতে আসমানীদের নেইক অধিকার,
জীর্ণ পাঁজর বুকের হাড়ে জ্বলছে হাহাকার।
Showing posts with label দ. Show all posts
Showing posts with label দ. Show all posts
দূরে আছো দূরে
রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্
তোমাকে পারিনি ছুঁতে, তোমার তোমাকে-
উষ্ণ দেহ ছেনে ছেনে কুড়িয়েছি সুখ,
পরস্পর খুড়ে খুড়ে নিভৃতি খুঁজেছি।
তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই।
যেভাবে ঝিনুক খুলে মুক্ত খোঁজে লোকে
আমাকে খুলেই তুমি পেয়েছো অসুখ,
পেয়েছো কিনারাহীন আগুনের নদী।
শরীরের তীব্রতম গভীর উল্লাসে
তোমার চোখের ভাষা বিস্ময়ে পড়েছি-
তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই।
জীবনের ’পরে রাখা বিশ্বাসের হাত
কখন শিথিল হয়ে ঝ’রে গেছে পাতা।
কখন হৃদয় ফেলে হৃদপিন্ড ছুঁয়ে
বোসে আছি উদাসীন আনন্দ মেলায়-
তোমাকে পারিনি ছুঁতে-আমার তোমাকে,
ক্ষাপাটে গ্রীবাজ যেন, নীল পটভূমি
তছ নছ কোরে গেছি শান্ত আকাশের।
অঝোর বৃষ্টিতে আমি ভিজিয়েছি হিয়া-
তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই।।
তোমাকে পারিনি ছুঁতে, তোমার তোমাকে-
উষ্ণ দেহ ছেনে ছেনে কুড়িয়েছি সুখ,
পরস্পর খুড়ে খুড়ে নিভৃতি খুঁজেছি।
তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই।
যেভাবে ঝিনুক খুলে মুক্ত খোঁজে লোকে
আমাকে খুলেই তুমি পেয়েছো অসুখ,
পেয়েছো কিনারাহীন আগুনের নদী।
শরীরের তীব্রতম গভীর উল্লাসে
তোমার চোখের ভাষা বিস্ময়ে পড়েছি-
তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই।
জীবনের ’পরে রাখা বিশ্বাসের হাত
কখন শিথিল হয়ে ঝ’রে গেছে পাতা।
কখন হৃদয় ফেলে হৃদপিন্ড ছুঁয়ে
বোসে আছি উদাসীন আনন্দ মেলায়-
তোমাকে পারিনি ছুঁতে-আমার তোমাকে,
ক্ষাপাটে গ্রীবাজ যেন, নীল পটভূমি
তছ নছ কোরে গেছি শান্ত আকাশের।
অঝোর বৃষ্টিতে আমি ভিজিয়েছি হিয়া-
তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই।।
দুরাশার মৃত্যু
সুকান্ত ভট্টাচার্য
দ্বারে মৃত্যু,
বনে বনে লেগেছে জোয়ার,
পিছনে কি পথ নেই আর?
আমাদের এই পলায়ন
জেনেছে মরণ,
অনুগামী ধূর্ত পিছে পিছে,
প্রস্থানের চেষ্টা হল মিছে।
দাবানল!
ব্যর্থ হল শুষ্ক অশ্রুজল,
বেনামী কৌশল
জেনেছে যে আরণ্যক প্রাণী
তাই শেষে নির্মূল বনানী।।
দ্বারে মৃত্যু,
বনে বনে লেগেছে জোয়ার,
পিছনে কি পথ নেই আর?
আমাদের এই পলায়ন
জেনেছে মরণ,
অনুগামী ধূর্ত পিছে পিছে,
প্রস্থানের চেষ্টা হল মিছে।
দাবানল!
ব্যর্থ হল শুষ্ক অশ্রুজল,
বেনামী কৌশল
জেনেছে যে আরণ্যক প্রাণী
তাই শেষে নির্মূল বনানী।।
দ্বিপ্রহরে
যতীন্দ্র মোহন বাগচী
বইয়ের পাতায় মন বসেনা, খোলা পাতা খোলাই পড়ে’ থাকে,
চোখের পাতায় ঘুম আসেনা---- দেহের ক্লান্তি বুঝাই বলো কা’কে ?
কাজের মাঝে হাত লাগাব, কোথাও কোন’ উত্সাহ নাই তার,
চেয়ে আছি চেয়েই আছি, চাওয়ার তবু নাইক কিছু আর !
বেলা বাড়ে, রোদ চড়ে’ যায়, প্রখর রবি দহে আকাশ তল,
ঝাঁঝাঁ করে ভিতর-বাহির, চোখের পথে শুকায় চোখের জল ;
মোহাচ্ছন্ন মৌন জগৎ, কোথাও যেন জীবনচেষ্টা নাহি,
ক্লিষ্ট আকাশ নির্ণিমেষে দিনের দাহ দেখছে শুধু চাহি’ !
ঘরে ঘরে আগল আঁটা, আমার ঘরেই মুক্ত শুধু দ্বার,
সেই যে খুলে’ চলে’ গেছে তেম্ নি আছে, কে দেয় উঠে’ আর !
পথের ধারে নিমের গাছে একটি কেবল তিক্ত মধুর শ্বাস
ক্ষণে ক্ষণে জানায় শুধু গোপন বুকের উদাসী উচ্ছ্বাস !
হাহা করে তপ্ত হাওয়া শষ্যহারা বসন্ত-শেষ মাঠে,
চোতের ফসল বিকিয়ে গেছে কবে কোথায় অজানা কোন্ হাটে !
উদার মলয় নিঃস্ব আজি, সাম্ নে শুধু ধূসর বালুচর
পঞ্চতপা দিক্-বিধবার বসন খানি লুট্ ছে নিরন্তর !
কোন্ পথে সে গেছে চলি’ মরু-বেলায় চিহ্নটি নাই তার,
লুপ্ত সকল শ্যামলিমা লয়ে তাহার মুগ্ধ উপাচার ;
জাগ্ ছে শুধু প্রখর দাহ তৃষ্ণাভরা বিশুষ্ক জিহ্বায়
দিনান্ত সে আস্ বে কখন ? দম্ কা বাতাস ধমক্ দিয়ে যায় !
বইয়ের পাতায় মন বসেনা, খোলা পাতা খোলাই পড়ে’ থাকে,
চোখের পাতায় ঘুম আসেনা---- দেহের ক্লান্তি বুঝাই বলো কা’কে ?
কাজের মাঝে হাত লাগাব, কোথাও কোন’ উত্সাহ নাই তার,
চেয়ে আছি চেয়েই আছি, চাওয়ার তবু নাইক কিছু আর !
বেলা বাড়ে, রোদ চড়ে’ যায়, প্রখর রবি দহে আকাশ তল,
ঝাঁঝাঁ করে ভিতর-বাহির, চোখের পথে শুকায় চোখের জল ;
মোহাচ্ছন্ন মৌন জগৎ, কোথাও যেন জীবনচেষ্টা নাহি,
ক্লিষ্ট আকাশ নির্ণিমেষে দিনের দাহ দেখছে শুধু চাহি’ !
ঘরে ঘরে আগল আঁটা, আমার ঘরেই মুক্ত শুধু দ্বার,
সেই যে খুলে’ চলে’ গেছে তেম্ নি আছে, কে দেয় উঠে’ আর !
পথের ধারে নিমের গাছে একটি কেবল তিক্ত মধুর শ্বাস
ক্ষণে ক্ষণে জানায় শুধু গোপন বুকের উদাসী উচ্ছ্বাস !
হাহা করে তপ্ত হাওয়া শষ্যহারা বসন্ত-শেষ মাঠে,
চোতের ফসল বিকিয়ে গেছে কবে কোথায় অজানা কোন্ হাটে !
উদার মলয় নিঃস্ব আজি, সাম্ নে শুধু ধূসর বালুচর
পঞ্চতপা দিক্-বিধবার বসন খানি লুট্ ছে নিরন্তর !
কোন্ পথে সে গেছে চলি’ মরু-বেলায় চিহ্নটি নাই তার,
লুপ্ত সকল শ্যামলিমা লয়ে তাহার মুগ্ধ উপাচার ;
জাগ্ ছে শুধু প্রখর দাহ তৃষ্ণাভরা বিশুষ্ক জিহ্বায়
দিনান্ত সে আস্ বে কখন ? দম্ কা বাতাস ধমক্ দিয়ে যায় !
দাসীপুত্র
যতীন্দ্র মোহন বাগচী
পরের দুয়ারে দাসী বটে আজি, তবু সে মোদেরই মা,---
ভুলিবারে চাই সতত সে কথা ; ভুলিবারে পারি না |
কাঙালের ঘরে যাহা কিছু জোটে, সে যে ধূলিমাখা খুদ,
উপবাস ক্ষীণ শীর্ণ বক্ষে শুকায়ে গিয়াছে দুধ,---
তবু তাই খেয়ে বাঁচে এই প্রাণ, তাই দিয়ে এই দেহ,
ধূলামাটি মাখা তাহারই অঙ্কে বাঁধি দুদিনের গেহ,
হাঁটিতে শিখেছি যার হাঁটু ধরে, যে বুকে মেলিয়া পা,
হক ভিখারিনী---তবু সে জননী, কেমনে ভুলিব তা?
মাতা বিনতার দুখের দুলাল, মানুষ নয় সে, পাখি!
মায়ের দুঃখ-ভরা দাসীত্ব ঘুচাইয়াছিল না কি?
যতই এ-হিয়া উঠে গুমরিয়া বিপদ-বেদনা-বিষে,
মানুষের ঘরে জন্ম লভিয়া সে-কথা ভুলিব কিসে?
কোথা প্রাণপণ প্রবল নিষ্ঠা, চিত্ত অকুতোভয়,
কই সে বেদনা, শক্তিসাধনা, পণ মৃত্যুঞ্জয়?
প্রচণ্ড তেজ চাই সে গরুড়---আমাদেরই মাঝে চাই,
অমৃতের লাগি সেই প্রাণপণ--- ভুলিবনা ভুলি নাই |
এস তপস্বী, উগ্রশক্তি, এস হে কর্মবীর,
কর দৃঢ় পণ মায়ের চক্ষে মুছাতে অশ্রুনীর ;
পায়ে-পায়ে যত বিভেদের বাধা ভুলায়ে পরস্পরে
ভায়ে ভায়ে আজি মিলাইতে হবে জননীর ভাঙা ঘরে ;
এস হে হিন্দু, এস খ্রীষ্টীয়, পারসী, মুসলমান
যে মায়ের বুকে জন্ম তোমার, রাখ আজি তার মান |
যে জননী আজ ভিখারিনী হয়ে ভুলেছে আপন বাণী,
অর্জিয়া তারি ধর্মরাজ্য কর তাঁরে রাজরাণী |
পরের দুয়ারে দাসী বটে আজি, তবু সে মোদেরই মা,---
ভুলিবারে চাই সতত সে কথা ; ভুলিবারে পারি না |
কাঙালের ঘরে যাহা কিছু জোটে, সে যে ধূলিমাখা খুদ,
উপবাস ক্ষীণ শীর্ণ বক্ষে শুকায়ে গিয়াছে দুধ,---
তবু তাই খেয়ে বাঁচে এই প্রাণ, তাই দিয়ে এই দেহ,
ধূলামাটি মাখা তাহারই অঙ্কে বাঁধি দুদিনের গেহ,
হাঁটিতে শিখেছি যার হাঁটু ধরে, যে বুকে মেলিয়া পা,
হক ভিখারিনী---তবু সে জননী, কেমনে ভুলিব তা?
মাতা বিনতার দুখের দুলাল, মানুষ নয় সে, পাখি!
মায়ের দুঃখ-ভরা দাসীত্ব ঘুচাইয়াছিল না কি?
যতই এ-হিয়া উঠে গুমরিয়া বিপদ-বেদনা-বিষে,
মানুষের ঘরে জন্ম লভিয়া সে-কথা ভুলিব কিসে?
কোথা প্রাণপণ প্রবল নিষ্ঠা, চিত্ত অকুতোভয়,
কই সে বেদনা, শক্তিসাধনা, পণ মৃত্যুঞ্জয়?
প্রচণ্ড তেজ চাই সে গরুড়---আমাদেরই মাঝে চাই,
অমৃতের লাগি সেই প্রাণপণ--- ভুলিবনা ভুলি নাই |
এস তপস্বী, উগ্রশক্তি, এস হে কর্মবীর,
কর দৃঢ় পণ মায়ের চক্ষে মুছাতে অশ্রুনীর ;
পায়ে-পায়ে যত বিভেদের বাধা ভুলায়ে পরস্পরে
ভায়ে ভায়ে আজি মিলাইতে হবে জননীর ভাঙা ঘরে ;
এস হে হিন্দু, এস খ্রীষ্টীয়, পারসী, মুসলমান
যে মায়ের বুকে জন্ম তোমার, রাখ আজি তার মান |
যে জননী আজ ভিখারিনী হয়ে ভুলেছে আপন বাণী,
অর্জিয়া তারি ধর্মরাজ্য কর তাঁরে রাজরাণী |
দাদার চিঠি
কুসুমকুমারী দাশ
[মুকুল, কার্তিক, ১৩০২]
আয়রে মনা, ভুতো, বুলী আয়রে তাড়াতাড়ি,
দাদার চিঠি এসেছে আজ, শুনাই তোদের পড়ি |
"কলকাতাতে এসেছি ভাই কালকে সকাল বেলা,
হেথায় কত গাড়ি, ঘোড়া, কত লোকের মেলা |
পথের পাশে সারি সারি দু'কাতারে বাড়ি
দিন রাত্তির হুস্ হুস্ করে ছুটেছে রেল গাড়ি |
আমি কি ভাই গেছি বুলে তোদের মলিন মুখ,
মনে পড়লে এখনও যে কেঁপে ওঠে বুক |
সেই যে মায়ের জলে ভরা স্নেহের নয়ন দু'টি
সেই যে আমার হাতটি ছেড়ে দিতে চায় নি পুঁটি---
ভূতি মনার আবদারে ভাব, দাদা, কোথায় যাবে?
যদি তুমি যেতে চাও তো সঙ্গে মোদের নেবে |"
সেই যে বুলী ঠোঁট কাপায়ে চুলের গোছা ছেড়ে
"যেতে নাহি দিব" ব'লে দাঁড়িয়েছিল দোরে---
সেই যে নলিন ষ্টেশন ঘরে চোখে কাপড় দিয়ে
কাঁদছিলি তুই হাতখানি মোর তোর হাতেতে নিয়ে |
সে সব কথা মনে প'ড়ে চোখে আসছে জল
দিনে দিনে কমে যাচ্ছে ভরা বুকের বল |
এসব কথা মায়ের কাছে বলো নাক' ভাই,
আজকে আমি এখান হ'তে বিদায় হ'তে চাই |
আর এক কথা, নিয়মমত লিখো আমায় চিঠি
কেমন আছে ভূতি, মনা, বুলী, ছোট পুঁটি?
মা বাবাকে প্রণাম দিয়ে বলবে আমার কথা,
সিটি কলেজ খুললে আমি ভর্তি হব তথা |
দু'চার দিন আর আছে বাকি, ভাল আছি আমি
আমার হ'য়ে ভাইবোনদের চুমু দিও তুমি |
বিদেশ এলে বুঝতে পারবে কেমন করে প্রাণ,
বুঝেছি ভাই কাকে ব'লে এক রক্তের টান |
এখন আমার চোখের কাছে যেন জগত্খানা
ভাসছে নিয়ে ভূতো, পুঁটি, বুলী, ননী, মনা |'
[মুকুল, কার্তিক, ১৩০২]
আয়রে মনা, ভুতো, বুলী আয়রে তাড়াতাড়ি,
দাদার চিঠি এসেছে আজ, শুনাই তোদের পড়ি |
"কলকাতাতে এসেছি ভাই কালকে সকাল বেলা,
হেথায় কত গাড়ি, ঘোড়া, কত লোকের মেলা |
পথের পাশে সারি সারি দু'কাতারে বাড়ি
দিন রাত্তির হুস্ হুস্ করে ছুটেছে রেল গাড়ি |
আমি কি ভাই গেছি বুলে তোদের মলিন মুখ,
মনে পড়লে এখনও যে কেঁপে ওঠে বুক |
সেই যে মায়ের জলে ভরা স্নেহের নয়ন দু'টি
সেই যে আমার হাতটি ছেড়ে দিতে চায় নি পুঁটি---
ভূতি মনার আবদারে ভাব, দাদা, কোথায় যাবে?
যদি তুমি যেতে চাও তো সঙ্গে মোদের নেবে |"
সেই যে বুলী ঠোঁট কাপায়ে চুলের গোছা ছেড়ে
"যেতে নাহি দিব" ব'লে দাঁড়িয়েছিল দোরে---
সেই যে নলিন ষ্টেশন ঘরে চোখে কাপড় দিয়ে
কাঁদছিলি তুই হাতখানি মোর তোর হাতেতে নিয়ে |
সে সব কথা মনে প'ড়ে চোখে আসছে জল
দিনে দিনে কমে যাচ্ছে ভরা বুকের বল |
এসব কথা মায়ের কাছে বলো নাক' ভাই,
আজকে আমি এখান হ'তে বিদায় হ'তে চাই |
আর এক কথা, নিয়মমত লিখো আমায় চিঠি
কেমন আছে ভূতি, মনা, বুলী, ছোট পুঁটি?
মা বাবাকে প্রণাম দিয়ে বলবে আমার কথা,
সিটি কলেজ খুললে আমি ভর্তি হব তথা |
দু'চার দিন আর আছে বাকি, ভাল আছি আমি
আমার হ'য়ে ভাইবোনদের চুমু দিও তুমি |
বিদেশ এলে বুঝতে পারবে কেমন করে প্রাণ,
বুঝেছি ভাই কাকে ব'লে এক রক্তের টান |
এখন আমার চোখের কাছে যেন জগত্খানা
ভাসছে নিয়ে ভূতো, পুঁটি, বুলী, ননী, মনা |'
দোতলার ল্যান্ডিং মুখোমুখি দুজন
আহসান হাবীব
মুখোমুখি ফ্ল্যাট
একজন সিঁড়িতে, একজন দরজায়
: আপনারা যাচ্ছেন বুঝি ?
: চলে যাচ্ছি, মালপত্র উঠে গেছে সব ।
: বছর দুয়েক হল, তাই নয় ?
: তারো বেশী । আপনার ডাক নাম শানু, ভালো নাম ?
: শাহানা, আপনার ?
: মাবু ।
: জানি ।
: মাহবুব হোসেন । আপনি খুব ভালো সেলাই জানেন ।
: কে বলেছে । আপনার তো অনার্স ফাইন্যাল, তাই নয় ?
: এবার ফাইন্যাল ।
: ফিজিক্স-এ অনার্স ।
: কী আশ্চর্য ! আপনি কেন ছাড়লেন হঠাৎ ?
: মা চান না । মানে ছেলেদের সঙ্গে বসে…
: সে যাক গে, পা সেরেছে ?
: কী করে জানলেন ?
: এই আর কি ! সেরে গেছে ?
: ও কিছুনা , প্যাসেজটা পিছলে ছিল মানে…
: সত্যি নয় । উচুঁ থেকে পড়ে গিয়ে…
: ধ্যাৎ । খাবার টেবিলে রোজ মাকে অতো জ্বালানো কি ভালো ?
: মা বলেছে ?
: শুনতে পাই । বছর দুয়েক হল, তাই নয় ?
: তারো বেশী । আপনার টবের গাছে ফুল এসেছে ?
: নেবেন ? না থাক । রিকসা এল, মা এলেন , যাই ।
: আপনি সন্ধ্যে বেলা ওভাবে কখনও পড়বেন না,
চোখ যাবে, যাই ।
: হলুদ শার্টের মাঝখানে বোতাম নেই, লাগিয়ে নেবেন, যাই ।
: যান, আপনার মা আসছেন । মা ডাকছেন, যাই ।
দেহতত্ত্ব
তসলিমা নাসরিন
এতকাল চেনা এই আমার শরীর
সময় সময় একে আমি নিজেই চিনি না।
একটি কর্কশ হাত
নানান কৌশল করে চন্দন চর্চ্চিত হাতখানি ছুঁলে
আমার স্নায়ুর ঘরে ঘণ্টি বাজে, ঘণ্টি বাজে
এ আমার নিজের শরীর
শরীরের ভাষা আমি পড়তে পারি না।
সে নিজেই তার কথা বলে নিজের ভাষায়।
তখন আঙুল, চোখ, ঠোঁট, এই মসৃণ পা
কেউই আমার নয়।
এ আমারই নয়
এ আমারই হাত।
অথচ এ হাত আমি সঠিক চিনি না
এই আমারই ঠোঁট, এ আমার জংঘা-উরু
এসবের কোন পেশী, কোন রোমকূপ
আমার অধীন নয়, নিয়ন্ত্রিত নয়।
স্নায়ুর দোতলা ঘরে ঘণ্টি বাজে
এই পৃথিবীতে আমি তবে কার ক্রীড়নক
পুরুষ না প্রকৃতির ?
আসলে পুরুষ নয়
প্রকৃতিই আমাকে বাজায়
আমি তার শখের সেতার।
পুরুষের স্পর্শে আমি
ঘুমন্ত শৈশব ভেঙে জেগে উঠি
আমার সমুদ্রে শুরু হয় হঠাৎ জোয়ার।
রক্তে মাংসে ভালবাসার সুগন্ধ পেলে
প্রকৃতিই আমাকে বাজায়
আমি তার শখের সেতার।
এতকাল চেনা এই আমার শরীর
সময় সময় একে আমি নিজেই চিনি না।
একটি কর্কশ হাত
নানান কৌশল করে চন্দন চর্চ্চিত হাতখানি ছুঁলে
আমার স্নায়ুর ঘরে ঘণ্টি বাজে, ঘণ্টি বাজে
এ আমার নিজের শরীর
শরীরের ভাষা আমি পড়তে পারি না।
সে নিজেই তার কথা বলে নিজের ভাষায়।
তখন আঙুল, চোখ, ঠোঁট, এই মসৃণ পা
কেউই আমার নয়।
এ আমারই নয়
এ আমারই হাত।
অথচ এ হাত আমি সঠিক চিনি না
এই আমারই ঠোঁট, এ আমার জংঘা-উরু
এসবের কোন পেশী, কোন রোমকূপ
আমার অধীন নয়, নিয়ন্ত্রিত নয়।
স্নায়ুর দোতলা ঘরে ঘণ্টি বাজে
এই পৃথিবীতে আমি তবে কার ক্রীড়নক
পুরুষ না প্রকৃতির ?
আসলে পুরুষ নয়
প্রকৃতিই আমাকে বাজায়
আমি তার শখের সেতার।
পুরুষের স্পর্শে আমি
ঘুমন্ত শৈশব ভেঙে জেগে উঠি
আমার সমুদ্রে শুরু হয় হঠাৎ জোয়ার।
রক্তে মাংসে ভালবাসার সুগন্ধ পেলে
প্রকৃতিই আমাকে বাজায়
আমি তার শখের সেতার।
দ্বিধা
মহাদেব সাহা
আমি এখনো বহু বিষয়ে মন ঠিক করতে পারিনি
যেমন কোনোদিন আমি বিয়ে করবো কি করবো না
অথবা কোনোদিন যাবো কি না বেশ্যালয়ে
কাউকে কখনো খুন করবো কি,
কোনোদিন চরস খেয়ে পড়ে থাকবো কিনা রাস্তায়
অথবা কিনা কোনো ফকির দরবেশের সাথে চলে
যাবো ধর্মশালায়
কোনো একদিন লাটভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের এই দুঃখ-
ধান্ধার জন্যে
খুব চেঁচিয়ে গালাগাল করবো কি না
একদিন সারারাত ঢিল ছুঁড়ে ভাঙবো কিনা ডিআইটি-র ঘরি
কোনোদিন সন্ধ্যেবেলা
পাওয়ার হাউসের সুইচটা টিপে
সারা শহরে বাধিয়ে দেবো কি না ভুতুরে কান্ড
……………………………….
……………………………….
মতিঝিলের বাণিজ্য এলাকায় পর পর কয়েক সপ্তাহ চালাবো
কিনা হরতাল
অথবা সস্তা জনসেবার বক্তৃতা দিয়ে নিজের আখের গোছাবো কিনা
নাকি হুজুর হুজুর করে কাটিয়ে দেবো জীবনটা
সত্যি কোনোদিন আমি এই দায়িত্বশীল লোকটা
যাচ্ছেতাই একটা কিছু করে বসবো কিনা
এমনি বহু বিষয়ে আমি এখনো মন ঠিক করতে পারিনি-
আমি এখনো বহু বিষয়ে মন ঠিক করতে পারিনি
যেমন কোনোদিন আমি বিয়ে করবো কি করবো না
অথবা কোনোদিন যাবো কি না বেশ্যালয়ে
কাউকে কখনো খুন করবো কি,
কোনোদিন চরস খেয়ে পড়ে থাকবো কিনা রাস্তায়
অথবা কিনা কোনো ফকির দরবেশের সাথে চলে
যাবো ধর্মশালায়
কোনো একদিন লাটভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের এই দুঃখ-
ধান্ধার জন্যে
খুব চেঁচিয়ে গালাগাল করবো কি না
একদিন সারারাত ঢিল ছুঁড়ে ভাঙবো কিনা ডিআইটি-র ঘরি
কোনোদিন সন্ধ্যেবেলা
পাওয়ার হাউসের সুইচটা টিপে
সারা শহরে বাধিয়ে দেবো কি না ভুতুরে কান্ড
……………………………….
……………………………….
মতিঝিলের বাণিজ্য এলাকায় পর পর কয়েক সপ্তাহ চালাবো
কিনা হরতাল
অথবা সস্তা জনসেবার বক্তৃতা দিয়ে নিজের আখের গোছাবো কিনা
নাকি হুজুর হুজুর করে কাটিয়ে দেবো জীবনটা
সত্যি কোনোদিন আমি এই দায়িত্বশীল লোকটা
যাচ্ছেতাই একটা কিছু করে বসবো কিনা
এমনি বহু বিষয়ে আমি এখনো মন ঠিক করতে পারিনি-
দেবীরা এখানে আসেন
অরুনেশ ঘোষ
-এই নদীর সঙ্গে সহবাস হয়েছে অরুনেশ?
-আমি আবিষ্কার করেছি জলের নাভিদেশ!
-কোথায় তোদের সন্তানেরা, এতো শুধু বালি আর বালি!
-অগুন্তি সন্তানকে খেয়ে ফেলেছে তাদের মা আর
বাকি কয়েকজনকে আমি
-বাহ্ এই কি বাবা-মায়ের দায়বদ্ধতা, করণীয়?
-যদি আমরা ওদের গ্রাস না করতাম, ওরা আমাদের
একদিন না একদিন কুরে কুরে খেয়ে নিতো!
নদীর বাতাস এসে ডেকে তোলে আস্তাকুর থেকে
ভোররাত্রিবেলা
দেবীরা এখানে আসেন আর আসে ঘেয়ো পাগলেরা
সস্নেহে বুলায় হাত শিশ্নে ও শ্মশ্রুতে, জলে ও জ্যোৎস্নায় মিশে
সুদূর উর্বশী
হাসে, বলে, হাজার লক্ষ-কোটি ধর্ষণ আমি
আত্মস্থ করেছি
দেবীর পাগলজাত শিশু কেঁদে ওঠে, যে-কোন এক মানবীর স্তন পেতে চায়
তখনই কাকেরা কা কা ক’রে ডেকে ওঠে, পূর্ণিমার চাঁদ অস্ত যায়!
-তুইও কী তাদেরই একজন নোস্, মিথ্যা, অসম্ভব?
-আমার জন্মের সময় মা ছিলেন শব
-তুইও কী পাগলের ঔরসজাত, মেনকা অথবা উর্বশীর?
-আমাকে কুড়িয়ে পায়, পেয়ে ঘেন্না হয় গ্রাম্য রমণীর
-তবু তো তোকে সে দিয়ে গেছে স্তন
-আজ নদী এসে বলে গেল, খুন ও ধর্ষণই করতে হবে, চল্
-চুপ কর্ মাতৃগামী, পিতৃহন্তারক…
-শান্ত হও। ঐ দেখো জলাশয়ে প্রশ্নকর্তা বক…
যে তুমি, আমাকে পাঠালে পাগলদের ধারা ধরে … লও নমস্কার
যে তুমি, একই যোনিতে জন্ম ও উপগত শিখিয়েছো … ধরো বেদনা আমার
যে তুমি, দেবীদের এনেছো ডেকে, পাগলকে ঘুমহীন স্বপ্ন দিলে ধার
যে তুমি, আমাকে স্বাধীন করলে, অনুমতি দিলে, একই নদীতে স্নান করবার
যে তুমি, সময় কিংবা সময় হীনতা, আমার ও নদীর নাও—আনত প্রণাম!
-এই নদীর সঙ্গে সহবাস হয়েছে অরুনেশ?
-আমি আবিষ্কার করেছি জলের নাভিদেশ!
-কোথায় তোদের সন্তানেরা, এতো শুধু বালি আর বালি!
-অগুন্তি সন্তানকে খেয়ে ফেলেছে তাদের মা আর
বাকি কয়েকজনকে আমি
-বাহ্ এই কি বাবা-মায়ের দায়বদ্ধতা, করণীয়?
-যদি আমরা ওদের গ্রাস না করতাম, ওরা আমাদের
একদিন না একদিন কুরে কুরে খেয়ে নিতো!
নদীর বাতাস এসে ডেকে তোলে আস্তাকুর থেকে
ভোররাত্রিবেলা
দেবীরা এখানে আসেন আর আসে ঘেয়ো পাগলেরা
সস্নেহে বুলায় হাত শিশ্নে ও শ্মশ্রুতে, জলে ও জ্যোৎস্নায় মিশে
সুদূর উর্বশী
হাসে, বলে, হাজার লক্ষ-কোটি ধর্ষণ আমি
আত্মস্থ করেছি
দেবীর পাগলজাত শিশু কেঁদে ওঠে, যে-কোন এক মানবীর স্তন পেতে চায়
তখনই কাকেরা কা কা ক’রে ডেকে ওঠে, পূর্ণিমার চাঁদ অস্ত যায়!
-তুইও কী তাদেরই একজন নোস্, মিথ্যা, অসম্ভব?
-আমার জন্মের সময় মা ছিলেন শব
-তুইও কী পাগলের ঔরসজাত, মেনকা অথবা উর্বশীর?
-আমাকে কুড়িয়ে পায়, পেয়ে ঘেন্না হয় গ্রাম্য রমণীর
-তবু তো তোকে সে দিয়ে গেছে স্তন
-আজ নদী এসে বলে গেল, খুন ও ধর্ষণই করতে হবে, চল্
-চুপ কর্ মাতৃগামী, পিতৃহন্তারক…
-শান্ত হও। ঐ দেখো জলাশয়ে প্রশ্নকর্তা বক…
যে তুমি, আমাকে পাঠালে পাগলদের ধারা ধরে … লও নমস্কার
যে তুমি, একই যোনিতে জন্ম ও উপগত শিখিয়েছো … ধরো বেদনা আমার
যে তুমি, দেবীদের এনেছো ডেকে, পাগলকে ঘুমহীন স্বপ্ন দিলে ধার
যে তুমি, আমাকে স্বাধীন করলে, অনুমতি দিলে, একই নদীতে স্নান করবার
যে তুমি, সময় কিংবা সময় হীনতা, আমার ও নদীর নাও—আনত প্রণাম!
দেশের বাণী
কায়কোবাদ
কে আর বুঝিবে হায় এ দেশের বাণী?
এ দেশের লোক যারা,
সকলইতো গেছে মারা,
আছে শুধু কতগুলি শৃগাল শকুনি!
সে কথা ভাবিতে হায়
এ প্রাণ ফেটে যায়,
হৃদয় ছাপিয়ে উঠে – চোখ ভরা পানি।
কে আর বুঝিবে হায় এ দেশের বাণী!
এ দেশের লোক যত
বিলাস ব্যসনে রত
এ দেশের দুঃখ কিছু নাহি বুঝে তারা।
দেশ গেল ছারেখারে,
এ কথা বলিব কারে?
ভেবে ভেবে তবু মোর হয়ে গেছে সারা!
প্রাণভরা হাহাকার
চোখ ভরা অশ্রুধার,
এ হৃদি যে হয়ে গেছে মরুভূমি-পারা!
এ দেশের দুঃখ কিছু নাহি বুঝে তারা?
এ দেশের লোক যারা,
সকলইতো গেছে মারা,
আছে শুধু কতগুলি শৃগাল শকুনি!
সে কথা ভাবিতে হায়
এ প্রাণ ফেটে যায়,
হৃদয় ছাপিয়ে উঠে – চোখ ভরা পানি।
কে আর বুঝিবে হায় এ দেশের বাণী!
এ দেশের লোক যত
বিলাস ব্যসনে রত
এ দেশের দুঃখ কিছু নাহি বুঝে তারা।
দেশ গেল ছারেখারে,
এ কথা বলিব কারে?
ভেবে ভেবে তবু মোর হয়ে গেছে সারা!
প্রাণভরা হাহাকার
চোখ ভরা অশ্রুধার,
এ হৃদি যে হয়ে গেছে মরুভূমি-পারা!
এ দেশের দুঃখ কিছু নাহি বুঝে তারা?
দেয়ালিকা
সুকান্ত ভট্টাচার্য
এক
দেয়ালে দেয়ালে মনের খেয়ালে
লিখি কথা।
আমি যে বেকার, পেয়েছি লেখার
স্বাধীনতা।
দুই
সকালে বিকালে মনের খেয়ালে
ইঁদারায়
দাঁড়িয়ে থাকলে অর্থটা তার
কি দাঁড়ায়?
তিন
কখন বাজল ছ’টা
প্রাসাদে প্রাসাদে ঝলসায় দেখি
শেষ সূর্যের ছটা -
স্তিমিত দিনের উদ্ধত ঘনঘটা।
চার
বেজে চলে রেডিও
সর্বদা গোলমাল করতেই
‘রেডি’ ও।
পাঁচ
জাপানী গো জাপানী
ভারতবর্ষে আসতে কি শেষ
ধরে গেল হাঁপানী?
ছয়
জার্মানী গো জার্মানী
তুমি ছিলে অজেয় বীর
এ কথা আজ আর মানি!
সাত
হে রাজকন্যে
তোমার জন্যে
এ জনারণ্যে
নেইকো ঠাঁই-
জানাই তাই।
আট
আঁধিয়ারে কেঁদে কয় সল্তেঃ
‘চাইনে চাইনে আমি জ্বলতে।’
দুর্মর
সুকান্ত ভট্টাচার্য
হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাত্ বাংলা দেশ
কেঁপে কেঁপে উঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে,
সে কোলাহলের রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ
জলে ও মাটিতে ভাঙ্গনের বেগ আসে।
হঠাত্ নিরীহ মাটিতে কখন,
জন্ম নিয়েছে সচেতনতার ধান,
গত আকালের মৃত্যুকে মুছে
আবার এসেছে বাংলা দেশের প্রাণ
“হয় ধান নয় প্রাণ” এ শব্দে
সারা দেশ দিশাহারা,
একবার মরে ভুলে গেছে আজ
মৃত্যুর ভয় তারা।
সাবাস, বাংলা দেশ, এ পৃথিবী
অবাক তাকিয়ে রয়:
জ্বলে পুড়ে-মার ছারখার
তবু মাথা নোয়াবার নয়।
এবার লোকের ঘরে ঘরে যাবে
সোনালী নয়কো, রক্তে রঙিন ধান,
দেখবে সকলে সেখানে জ্বলছে
দাউ দাউ করে বাংলা দেশের প্রাণ॥
হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাত্ বাংলা দেশ
কেঁপে কেঁপে উঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে,
সে কোলাহলের রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ
জলে ও মাটিতে ভাঙ্গনের বেগ আসে।
হঠাত্ নিরীহ মাটিতে কখন,
জন্ম নিয়েছে সচেতনতার ধান,
গত আকালের মৃত্যুকে মুছে
আবার এসেছে বাংলা দেশের প্রাণ
“হয় ধান নয় প্রাণ” এ শব্দে
সারা দেশ দিশাহারা,
একবার মরে ভুলে গেছে আজ
মৃত্যুর ভয় তারা।
সাবাস, বাংলা দেশ, এ পৃথিবী
অবাক তাকিয়ে রয়:
জ্বলে পুড়ে-মার ছারখার
তবু মাথা নোয়াবার নয়।
এবার লোকের ঘরে ঘরে যাবে
সোনালী নয়কো, রক্তে রঙিন ধান,
দেখবে সকলে সেখানে জ্বলছে
দাউ দাউ করে বাংলা দেশের প্রাণ॥
দুঃখের আরেক নাম
হেলাল হাফিজ
আমাকে স্পর্শ করো, নিবিড় স্পর্শ করো নারী।
অলৌকিক কিছু নয়,
নিতান্তই মানবিক যাদুর মালিক তুমি
তোমার স্পর্শেই শুধু আমার উদ্ধার।
আমাকে উদ্ধার করো পাপ থেকে,
পঙ্কিলতা থেকে, নিশ্চিত পতন থেকে।
নারী তুমি আমার ভিতরে হও প্রবাহিত দুর্বিনীত নদীর মতন,
মিলেমিশে একাকার হয়ে এসো বাঁচি
নিদারুণ দুঃসময়ে বড়ো বেশি অসহায় একা পড়ে আছি।
তুমুল ফাল্গুন যায়, ডাকে না কোকিল কোনো ডালে,
আকস্মিক দু’একটা কুহু কুহু আর্তনাদ
পৃথিবীকে উপহাস করে।
একদিন কোকিলেরো সুসময় ছিলো, আজ তারা
আমার মতোই বেশ দুঃসময়ে আছে
পাখিদের নীলাকাশ বিষাক্ত হয়ে গেছে সভ্যতার অশ্লীল বাতাসে।
এখন তুমিই বলো নারী
তোমার উদ্যান ছাড়া আমি আর কোথায় দাঁড়াবো।
আমাকে দাঁড়াতে দাও বিশুদ্ধ পরিপূর্ণতায়,
ব্যাকুল শুশ্রুষা দিয়ে আমাকে উদ্ধার করো
নারী তুমি শৈল্পিক তাবিজ,
এতোদিন নারী ও রমনীহীন ছিলাম বলেই ছিলো
দুঃখের আরেক নাম হেলাল হাফিজ।
আমাকে স্পর্শ করো, নিবিড় স্পর্শ করো নারী।
অলৌকিক কিছু নয়,
নিতান্তই মানবিক যাদুর মালিক তুমি
তোমার স্পর্শেই শুধু আমার উদ্ধার।
আমাকে উদ্ধার করো পাপ থেকে,
পঙ্কিলতা থেকে, নিশ্চিত পতন থেকে।
নারী তুমি আমার ভিতরে হও প্রবাহিত দুর্বিনীত নদীর মতন,
মিলেমিশে একাকার হয়ে এসো বাঁচি
নিদারুণ দুঃসময়ে বড়ো বেশি অসহায় একা পড়ে আছি।
তুমুল ফাল্গুন যায়, ডাকে না কোকিল কোনো ডালে,
আকস্মিক দু’একটা কুহু কুহু আর্তনাদ
পৃথিবীকে উপহাস করে।
একদিন কোকিলেরো সুসময় ছিলো, আজ তারা
আমার মতোই বেশ দুঃসময়ে আছে
পাখিদের নীলাকাশ বিষাক্ত হয়ে গেছে সভ্যতার অশ্লীল বাতাসে।
এখন তুমিই বলো নারী
তোমার উদ্যান ছাড়া আমি আর কোথায় দাঁড়াবো।
আমাকে দাঁড়াতে দাও বিশুদ্ধ পরিপূর্ণতায়,
ব্যাকুল শুশ্রুষা দিয়ে আমাকে উদ্ধার করো
নারী তুমি শৈল্পিক তাবিজ,
এতোদিন নারী ও রমনীহীন ছিলাম বলেই ছিলো
দুঃখের আরেক নাম হেলাল হাফিজ।
দুঃসময়ে আমার যৌবন
হেলাল হাফিজ
মানব জন্মের নামে হবে কলঙ্ক হবে
এরকম দুঃসময়ে আমি যদি মিছিলে না যাই,
উত্তর পুরুষে ভীরু কাপুরুষের উপমা হবো
আমার যৌবন দিয়ে এমন দুর্দিনে আজ
শুধু যদি নারীকে সাজাই।
মানব জন্মের নামে হবে কলঙ্ক হবে
এরকম দুঃসময়ে আমি যদি মিছিলে না যাই,
উত্তর পুরুষে ভীরু কাপুরুষের উপমা হবো
আমার যৌবন দিয়ে এমন দুর্দিনে আজ
শুধু যদি নারীকে সাজাই।
দিঘির ভিতরে ছায়া
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
দিঘির ভিতরে ছায়া ধীরে বড় হয়, ধীরে-ধীরে
নিজেকে গুটিয়ে আনে ফের ।
মাঝে মাঝে হাওয়া দেয় । জালের শরীরে
দোলা লাগে । ত্রিকালে দণ্ডায়মান বৃদ্ধ অশথের
শাখা-প্রশাখায়
ছড়ায় অস্ফুট কানাকানি ।
তীব্র নীল আকাশে নিঃসঙ্গ চিল উড়ে চলে যায় ।
জলের উপরে ভাসে অশথের শান্ত ছায়াখানি ।
আজও ছায়াখানি সেই জলের উপর শুয়ে আছে ।
মাঝে-মাঝে হাওয়া দেয়, মাঝে মাঝে ছায়া
কেঁপে ওঠে । কাছে
ঘরবাড়ি নেই, জনমনিষ্যির মমতা-মায়ার
চিহ্ন নেই । চতুর্দিকে মাঠ, শুধু মাঠ ।
মাঠের ভিতরে দিঘি, দিঘির ভিতরে ছায়া পড়ে ।
হাহা করে আকাশের জানালা-কপাট ।
মাঠ পাড়ি দিয়ে হাওয়া ছুটে যায় গ্রামে ও শহরে ।
দিঘির ভিতরে ছায়া ধীরে বড় হয়, ধীরে-ধীরে
নিজেকে গুটিয়ে আনে ফের ।
মাঝে মাঝে হাওয়া দেয় । জালের শরীরে
দোলা লাগে । ত্রিকালে দণ্ডায়মান বৃদ্ধ অশথের
শাখা-প্রশাখায়
ছড়ায় অস্ফুট কানাকানি ।
তীব্র নীল আকাশে নিঃসঙ্গ চিল উড়ে চলে যায় ।
জলের উপরে ভাসে অশথের শান্ত ছায়াখানি ।
আজও ছায়াখানি সেই জলের উপর শুয়ে আছে ।
মাঝে-মাঝে হাওয়া দেয়, মাঝে মাঝে ছায়া
কেঁপে ওঠে । কাছে
ঘরবাড়ি নেই, জনমনিষ্যির মমতা-মায়ার
চিহ্ন নেই । চতুর্দিকে মাঠ, শুধু মাঠ ।
মাঠের ভিতরে দিঘি, দিঘির ভিতরে ছায়া পড়ে ।
হাহা করে আকাশের জানালা-কপাট ।
মাঠ পাড়ি দিয়ে হাওয়া ছুটে যায় গ্রামে ও শহরে ।
দৃশ্যের বাহিরে
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
সিতাংশু, আমাকে তুই যতো কিছু বলতে চাস, বল।
যতো কথা বলতে চাস, বল।
অথবা একটাও কথা বলিসনে, তুই
বলতে দে আমাকে তোর কথা।
সিতাংশু, আমি যে তোর সমস্ত কথাই জেনে গেছি।
আমি জেনে গেছি।
কী বলবি আমাকে তুই, সিতাংশু ? বলবি যে,
ঘরের ভিতরে তোর শান্তি নেই, তোর
শান্তি নেই, তোর
ঘরের ভিতরে বড়ো অন্ধকার, বড়ো
অন্ধকার, বড়ো
বেশি অন্ধকার তোর ঘরের ভিতরে।
(সিতাংশু, আমি যে তোর সমস্ত কথাই জেনে গেছি।
আমি জেনে গেছি।)
কী বলবি আমাকে তুই, সিতাংশু ? বলবি যে,
দৃশ্যের সংসার থেকে তুই
(সংসারের যাবতীয় অস্থির দৃশ্যের থেকে তুই)
স্থিরতর কোনো-এক দৃশ্যে যেতে গিয়ে
গিয়েছিস স্থির এক দৃশ্যহীনতায়।
অনন্ত রাত্রির ঠাণ্ডা নিদারুণ দৃশ্যহীনতায়।
দৃশ্যের বাহিরে তোর ঘরে।
জানিরে, সিতাংশু, তোর ঘরের চরিত্র আমি জানি।
ওখানে অনেক কষ্টে শোয়া চলে, কোনোক্রমে দাঁড়ানো চলে না।
ও-ঘরে জানালা নেই, আর
ও-ঘরে জানালা নেই, আর
মাথার দু’ইঞ্চি মাত্র উর্ধ্বে ছাত। মেঝে
স্যাঁতস্যাঁতে। দরোজা নেই। একটাও দরোজা নেই। তোর
চারদিকে কাঠের দেয়াল।
এবং দেয়ালে নেই ঈশ্বরের ছবি।
এবং দেয়ালে নেই শয়তানের ছবি।
(তা যদি থাকত, তবে ঈশ্বরের ছবির অভাব
ভুলে যাওয়া যেত।) নেই, তা-ও নেই তোর
নির্বিকার ঘরের ভিতরে।
না, আমি যাব না তোর ঘরের ভিতরে।
যাব না, সিতাংশু, আমি কিছুতে যাব না।
যেখানে ঈশ্বর নেই, যেখানে শয়তান নেই, কোনো-কিছু নেই,
প্রেম নেই, ঘৃণা নেই, সেখানে যাবো না।
যাব না, যেহেতু আমি মূর্তিহীন ঈশ্বরের থেকে
দৃশ্যমান শয়তানের মুখশ্রী এখনো ভালোবাসি।
না, আমি যাব না তোর ঘরের ভিতরে।
সিতাংশু, তুই-ই বা কেন গেলি ?
অস্থির দৃশ্যের থেকে কেন গেলি তুই
স্থির নির্বিকার ওই দৃশ্যহীনতায় ?
সিতাংশু, আমি যে তোর সমস্ত কথাই জেনে গেছি।
আমি জেনে গেছি।
দৃশ্যের ভিতর থেকে দৃশ্যের বাহিরে
প্রেম-ঘৃণা-রক্ত থেকে প্রেম-ঘৃণা-রক্তের বাহিরে
গিয়ে তোর শান্তি নেই, তোর
শান্তি নেই, তোর
ঘরের ভিতরে বড়ো অন্ধকার, বড়ো
অন্ধকার, বড়ো
বেশি অন্ধকার তোর ঘরের ভিতরে।
সিতাংশু, আমাকে তুই যতো কিছু বলতে চাস, বল।
যতো কথা বলতে চাস, বল।
অথবা একটাও কথা বলিসনে, তুই
বলতে দে আমাকে তোর কথা।
সিতাংশু, আমি যে তোর সমস্ত কথাই জেনে গেছি।
আমি জেনে গেছি।
কী বলবি আমাকে তুই, সিতাংশু ? বলবি যে,
ঘরের ভিতরে তোর শান্তি নেই, তোর
শান্তি নেই, তোর
ঘরের ভিতরে বড়ো অন্ধকার, বড়ো
অন্ধকার, বড়ো
বেশি অন্ধকার তোর ঘরের ভিতরে।
(সিতাংশু, আমি যে তোর সমস্ত কথাই জেনে গেছি।
আমি জেনে গেছি।)
কী বলবি আমাকে তুই, সিতাংশু ? বলবি যে,
দৃশ্যের সংসার থেকে তুই
(সংসারের যাবতীয় অস্থির দৃশ্যের থেকে তুই)
স্থিরতর কোনো-এক দৃশ্যে যেতে গিয়ে
গিয়েছিস স্থির এক দৃশ্যহীনতায়।
অনন্ত রাত্রির ঠাণ্ডা নিদারুণ দৃশ্যহীনতায়।
দৃশ্যের বাহিরে তোর ঘরে।
জানিরে, সিতাংশু, তোর ঘরের চরিত্র আমি জানি।
ওখানে অনেক কষ্টে শোয়া চলে, কোনোক্রমে দাঁড়ানো চলে না।
ও-ঘরে জানালা নেই, আর
ও-ঘরে জানালা নেই, আর
মাথার দু’ইঞ্চি মাত্র উর্ধ্বে ছাত। মেঝে
স্যাঁতস্যাঁতে। দরোজা নেই। একটাও দরোজা নেই। তোর
চারদিকে কাঠের দেয়াল।
এবং দেয়ালে নেই ঈশ্বরের ছবি।
এবং দেয়ালে নেই শয়তানের ছবি।
(তা যদি থাকত, তবে ঈশ্বরের ছবির অভাব
ভুলে যাওয়া যেত।) নেই, তা-ও নেই তোর
নির্বিকার ঘরের ভিতরে।
না, আমি যাব না তোর ঘরের ভিতরে।
যাব না, সিতাংশু, আমি কিছুতে যাব না।
যেখানে ঈশ্বর নেই, যেখানে শয়তান নেই, কোনো-কিছু নেই,
প্রেম নেই, ঘৃণা নেই, সেখানে যাবো না।
যাব না, যেহেতু আমি মূর্তিহীন ঈশ্বরের থেকে
দৃশ্যমান শয়তানের মুখশ্রী এখনো ভালোবাসি।
না, আমি যাব না তোর ঘরের ভিতরে।
সিতাংশু, তুই-ই বা কেন গেলি ?
অস্থির দৃশ্যের থেকে কেন গেলি তুই
স্থির নির্বিকার ওই দৃশ্যহীনতায় ?
সিতাংশু, আমি যে তোর সমস্ত কথাই জেনে গেছি।
আমি জেনে গেছি।
দৃশ্যের ভিতর থেকে দৃশ্যের বাহিরে
প্রেম-ঘৃণা-রক্ত থেকে প্রেম-ঘৃণা-রক্তের বাহিরে
গিয়ে তোর শান্তি নেই, তোর
শান্তি নেই, তোর
ঘরের ভিতরে বড়ো অন্ধকার, বড়ো
অন্ধকার, বড়ো
বেশি অন্ধকার তোর ঘরের ভিতরে।
দিন আনি, দিন খাই
তারাপদ রায়
আমরা যারা দিন আনি, দিন খাই,
আমরা যারা হাজার হাজার দিন খেয়ে ফেলেছি,
বৃষ্টির দিন, মেঘলা দিন, কুয়াশা ঘেরা দিন,
স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে অধীর প্রতীক্ষারত দিন,
অপমানে মাথা নিচু করে চোরের মতো চলে যাওয়া দিন,
খালি পেট, ছেঁড়া চটি, ঘামে ভেজা দিন,
নীল পাহাড়ের ওপারে, সবুজ বনের মাথায় দিন,
নৌকার সাদা জালে ঢেউয়ের চুড়ায় ভেসে যাওয়ার দিন,
হৈ হৈ অট্টহাসিতে কলরোল কোলাহল ভরা দিন,
হঠাৎ দক্ষিণের খোলা বারান্দায় আলো ঝলমলে দিন-
এই সব দিন আমরা কেমন করে এনেছিলাম, কিভাবে,
কেউ যদি হঠাৎ জানতে চায়, এ রকম একটা প্রশ্ন করে,
আমরা যারা কিছুতেই সদুত্তর দিতে পারবো না,
কিছুই বলতে পারবো না, কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারবো না
কি করে আমরা দিন এনেছিলাম,
কেন আমরা দিন আনি, কেন আমরা দিন খাই,
কেমন করে আমরা দিন আনি, দিন খাই।
আমরা যারা দিন আনি, দিন খাই,
আমরা যারা হাজার হাজার দিন খেয়ে ফেলেছি,
বৃষ্টির দিন, মেঘলা দিন, কুয়াশা ঘেরা দিন,
স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে অধীর প্রতীক্ষারত দিন,
অপমানে মাথা নিচু করে চোরের মতো চলে যাওয়া দিন,
খালি পেট, ছেঁড়া চটি, ঘামে ভেজা দিন,
নীল পাহাড়ের ওপারে, সবুজ বনের মাথায় দিন,
নৌকার সাদা জালে ঢেউয়ের চুড়ায় ভেসে যাওয়ার দিন,
হৈ হৈ অট্টহাসিতে কলরোল কোলাহল ভরা দিন,
হঠাৎ দক্ষিণের খোলা বারান্দায় আলো ঝলমলে দিন-
এই সব দিন আমরা কেমন করে এনেছিলাম, কিভাবে,
কেউ যদি হঠাৎ জানতে চায়, এ রকম একটা প্রশ্ন করে,
আমরা যারা কিছুতেই সদুত্তর দিতে পারবো না,
কিছুই বলতে পারবো না, কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারবো না
কি করে আমরা দিন এনেছিলাম,
কেন আমরা দিন আনি, কেন আমরা দিন খাই,
কেমন করে আমরা দিন আনি, দিন খাই।
দারিদ্র্যরেখা
তারাপদ রায়
আমি নিতান্ত গরিব ছিলাম, খুবই গরিব।
আমার ক্ষুধার অন্ন ছিল না,
আমার লজ্জা নিবারণের কাপড় ছিল না,
আমার মাথার উপরে আচ্ছাদন ছিল না।
অসীম দয়ার শরীর আপনার
আপনি এসে আমাকে বললেন,
‘না, গরিব কথাটা খুব খারাপ,
ওতে মানুষের মর্যাদাহানি হয়,
তুমি আসলে দরিদ্র।’
অপরিসীম দারিদ্র্যের মধ্যে আমার কষ্টের দিন,
আমার কষ্টের দিন, দিনের পর দিন আর শেষ হয় না,
আমি আরো জীর্ণ আরো ক্লিষ্ট হয়ে গেলাম,
হঠাৎ আপনি আবার এলেন, এসে বললেন,
‘দ্যাখো, বিবেচনা করে দেখলাম
দরিদ্র শব্দটাও ভালো নয়, তুমি হলে নিঃস্ব।’
দীর্ঘ নিঃস্বতায় আমার দিনরাত্রি
গনগনে গরমে ধুঁকতে ধুঁকতে,
শীতের রাতের ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে
বর্ষার জলে ভিজতে ভিজতে
আমি নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হয়ে গেলাম।
আপনার কিন্তু ক্লান্তি নেই,
আপনি আবার এলেন, আপনি বললেন,
‘তোমার নিঃস্বতার কোনো মানে হয় না।
তুমি নিঃস্ব হবে কেন,
তোমাকে চিরকাল শুধু বঞ্চনা করা হয়েছে,
তুমি বঞ্চিত, তুমি চির বঞ্চিত।’
আমার বঞ্চনার অবসান নেই,
বছরের পর বছর আধপেটা খেয়ে,
উদোম আকাশের নিচে রাস্তায় শুয়ে,
কঙ্কালসার হয়ে আমার বেঁচে থাকা।
কিন্তু আপনি আমাকে ভোলেননি,
এবার আপনার মুষ্টিবদ্ধ হাত,
আপনি এসে উদাত্ত কণ্ঠে ডাক দিলেন,
‘জাগো, জাগো সর্বহারা।’
তখন আর আমার জাগবার ক্ষমতা নেই,
ক্ষুধায় অনাহারে আমি শেষ হয়ে এসেছি,
আমার বুকের পাঁজর হাপরের মতো ওঠানামা করছে,
আপনার উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে
আমি তাল মেলাতে পারছি না।
ইতিমধ্যে আরো বহুদিন গিয়েছে,
আপনি এখন আরো বুদ্ধিমান,
আরো চৌকস হয়েছেন।
এবার আপনি একটি ব্ল্যাক-বোর্ড নিয়ে এসেছেন,
সেখানে চকখড়ি দিয়ে যত্ন করে
একটা ঝকঝকে লম্বা লাইন টেনে দিয়েছেন;
এবার বড়ো পরিশ্রম হয়েছে আপনার,
কপালের ঘাম মুছে আমাকে বলেছেন,
‘এই যে রেখা দেখছ, এর নিচে,
অনেক নিচে তুমি রয়েছ।’
চমৎকার !
আপনাকে ধন্যবাদ, বহু ধন্যবাদ !
আমার গরিবপনার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার দারিদ্র্যের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার নিঃস্বতার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার বঞ্চনার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার সর্বহারাত্বের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ,
আর সবশেষে ঐ ঝকঝকে লম্বা রেখাটি,
ঐ উজ্জ্বল উপহারটির জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ।
কিন্তু, ক্রমশ, আমার ক্ষুধার অন্ন এখন আরো কমে গেছে.
আমার লজ্জা নিবারণের কাপড় এখন আরো ছিঁড়ে গেছে,
আমার মাথার উপরের আচ্ছদন আরো সরে গেছে।
কিন্তু ধন্যবাদ,
হে প্রগাঢ় হিতৈষী, আপনাকে বহু ধন্যবাদ।
আমি নিতান্ত গরিব ছিলাম, খুবই গরিব।
আমার ক্ষুধার অন্ন ছিল না,
আমার লজ্জা নিবারণের কাপড় ছিল না,
আমার মাথার উপরে আচ্ছাদন ছিল না।
অসীম দয়ার শরীর আপনার
আপনি এসে আমাকে বললেন,
‘না, গরিব কথাটা খুব খারাপ,
ওতে মানুষের মর্যাদাহানি হয়,
তুমি আসলে দরিদ্র।’
অপরিসীম দারিদ্র্যের মধ্যে আমার কষ্টের দিন,
আমার কষ্টের দিন, দিনের পর দিন আর শেষ হয় না,
আমি আরো জীর্ণ আরো ক্লিষ্ট হয়ে গেলাম,
হঠাৎ আপনি আবার এলেন, এসে বললেন,
‘দ্যাখো, বিবেচনা করে দেখলাম
দরিদ্র শব্দটাও ভালো নয়, তুমি হলে নিঃস্ব।’
দীর্ঘ নিঃস্বতায় আমার দিনরাত্রি
গনগনে গরমে ধুঁকতে ধুঁকতে,
শীতের রাতের ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে
বর্ষার জলে ভিজতে ভিজতে
আমি নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হয়ে গেলাম।
আপনার কিন্তু ক্লান্তি নেই,
আপনি আবার এলেন, আপনি বললেন,
‘তোমার নিঃস্বতার কোনো মানে হয় না।
তুমি নিঃস্ব হবে কেন,
তোমাকে চিরকাল শুধু বঞ্চনা করা হয়েছে,
তুমি বঞ্চিত, তুমি চির বঞ্চিত।’
আমার বঞ্চনার অবসান নেই,
বছরের পর বছর আধপেটা খেয়ে,
উদোম আকাশের নিচে রাস্তায় শুয়ে,
কঙ্কালসার হয়ে আমার বেঁচে থাকা।
কিন্তু আপনি আমাকে ভোলেননি,
এবার আপনার মুষ্টিবদ্ধ হাত,
আপনি এসে উদাত্ত কণ্ঠে ডাক দিলেন,
‘জাগো, জাগো সর্বহারা।’
তখন আর আমার জাগবার ক্ষমতা নেই,
ক্ষুধায় অনাহারে আমি শেষ হয়ে এসেছি,
আমার বুকের পাঁজর হাপরের মতো ওঠানামা করছে,
আপনার উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে
আমি তাল মেলাতে পারছি না।
ইতিমধ্যে আরো বহুদিন গিয়েছে,
আপনি এখন আরো বুদ্ধিমান,
আরো চৌকস হয়েছেন।
এবার আপনি একটি ব্ল্যাক-বোর্ড নিয়ে এসেছেন,
সেখানে চকখড়ি দিয়ে যত্ন করে
একটা ঝকঝকে লম্বা লাইন টেনে দিয়েছেন;
এবার বড়ো পরিশ্রম হয়েছে আপনার,
কপালের ঘাম মুছে আমাকে বলেছেন,
‘এই যে রেখা দেখছ, এর নিচে,
অনেক নিচে তুমি রয়েছ।’
চমৎকার !
আপনাকে ধন্যবাদ, বহু ধন্যবাদ !
আমার গরিবপনার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার দারিদ্র্যের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার নিঃস্বতার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার বঞ্চনার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার সর্বহারাত্বের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ,
আর সবশেষে ঐ ঝকঝকে লম্বা রেখাটি,
ঐ উজ্জ্বল উপহারটির জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ।
কিন্তু, ক্রমশ, আমার ক্ষুধার অন্ন এখন আরো কমে গেছে.
আমার লজ্জা নিবারণের কাপড় এখন আরো ছিঁড়ে গেছে,
আমার মাথার উপরের আচ্ছদন আরো সরে গেছে।
কিন্তু ধন্যবাদ,
হে প্রগাঢ় হিতৈষী, আপনাকে বহু ধন্যবাদ।
দিকপ্রান্তে
সুকান্ত ভট্টাচার্য
ভাঙন নেপথ্য পৃথিবীতে;
অদৃশ্য কালের শত্রু প্রচ্ছন্ন জোয়ারে,
অনেক বিপন্ন জীব ক্ষয়িষ্ণু খোঁয়াড়ে
উন্মুখ নিঃশেষে কেড়ে নিতে,
দুর্গম বিষণ্ণ শেষ শীতে।
বীভৎস প্রাণের কোষে কোষে
নিঃশব্দে ধ্বংসের বীজ নির্দিষ্ট আয়ুতে
পশেছে আঁদার রাত্রে- প্রত্যেক স্নায়ুতে;-
গোপনে নক্ষত্র গেছে খসে
আরক্তিম আদিম প্রদোষে।।
দিনের নীলাভ শেষ আলো
জানাল আসন্ন রাত্রি দুর্লক্ষ্য সংকেতে।
অনেক কাস্তের শব্দ নিঃস্ব ধানেক্ষেতে
সেই রাত্রে হাওয়ায় মিলাল;
দিক্প্রান্তে সূর্য চমকাল।।
ভাঙন নেপথ্য পৃথিবীতে;
অদৃশ্য কালের শত্রু প্রচ্ছন্ন জোয়ারে,
অনেক বিপন্ন জীব ক্ষয়িষ্ণু খোঁয়াড়ে
উন্মুখ নিঃশেষে কেড়ে নিতে,
দুর্গম বিষণ্ণ শেষ শীতে।
বীভৎস প্রাণের কোষে কোষে
নিঃশব্দে ধ্বংসের বীজ নির্দিষ্ট আয়ুতে
পশেছে আঁদার রাত্রে- প্রত্যেক স্নায়ুতে;-
গোপনে নক্ষত্র গেছে খসে
আরক্তিম আদিম প্রদোষে।।
দিনের নীলাভ শেষ আলো
জানাল আসন্ন রাত্রি দুর্লক্ষ্য সংকেতে।
অনেক কাস্তের শব্দ নিঃস্ব ধানেক্ষেতে
সেই রাত্রে হাওয়ায় মিলাল;
দিক্প্রান্তে সূর্য চমকাল।।
Subscribe to:
Posts (Atom)