Showing posts with label . Show all posts
Showing posts with label . Show all posts

ভালবাসার সময় তো নেই

রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্

ভালবাসার সময় তো নেই
ব্যস্ত ভীষন কাজে,
হাত রেখো না বুকের গাড় ভাজে।
ঘামের জলে ভিজে সাবাড়
করাল রৌদ্দুরে,
কাছএ পাই না, হৃদয়- রোদ দূরে।
কাজের মাঝে দিন কেটে যায়
কাজের কোলাহল
তৃষ্নাকে ছোয় ঘড়ায় তোলা জল।
নদী আমার বয় না পাশে
স্রোতের দেখা নেই,
আটকে রাখে গেরস্থালির লেই।
তোমার দিকে ফিরবো কখন
বন্দী আমার চোখ
পাহারা দেয় খল সামাজিক নখ।

ভালোবাসার সংজ্ঞা

রফিক আজাদ

ভালোবাসা মানে দুজনের পাগলামি,
পরস্পরকে হৃদয়ের কাছে টানা;
ভালোবাসা মানে জীবনের ঝুঁকি নেয়া,
বিরহ-বালুতে খালিপায়ে হাঁটাহাঁটি;
ভালোবাসা মানে একে অপরের প্রতি
খুব করে ঝুঁকে থাকা;
ভালোবাসা মানে ব্যাপক বৃষ্টি, বৃষ্টির একটানা
ভিতরে-বাহিরে দুজনের হেঁটে যাওয়া;
ভালোবাসা মানে ঠাণ্ডা কফির পেয়ালা সামনে
অবিরল কথা বলা;
ভালোবাসা মানে শেষ হয়ে-যাওয়া কথার পরেও
মুখোমুখি বসে থাকা।

ভালোবাসা দিতে পারি

বিনয় মজুমদার

ভালোবাসা দিতে পারি, তোমরা কি গ্রহণে সক্ষম?
লীলাময়ী করপুটে তোমাদের সবই ঝ’রে যায় –
হাসি, জ্যোৎস্না, ব্যথা, স্মৃতি, অবশিষ্ট কিছুই থাকে না।
এ আমার অভিজ্ঞতা। পারাবতগুলি জ্যোৎস্নায়
কখনো ওড়ে না; তবু ভালোবাসা দিতে পারি।
শাশ্বত, সহজতম এই দান — শুধু অঙ্কুরের
উদগমে বাধা না দেওয়া, নিষ্পেষিত অনালোকে রেখে
ফ্যাকাশে হলুদবর্ণ না ক’রে শ্যামল হতে দেওয়া।
এতই সহজ, তবু বেদনায় নিজ হাতে রাখি
মৃত্যুর প্রস্তর, যাতে কাউকে না ভালোবেসে ফেলে ফেলি।
গ্রহণে সক্ষম নও। পারাবত, বৃক্ষচুড়া থেকে
পতন হলেও তুমি আঘাত পাও না, উড়ে যাবে।
প্রাচীন চিত্রের মতো চিরস্থায়ী হাসি নিয়ে তুমি
চ’লে যাবে; ক্ষত নিয়ে যন্ত্রণায় স্তব্ধ হব আমি।

ভুল প্রেমে কেটে গেছে তিরিশ বসন্ত

তসলিমা নাসরিন

ভুল প্রেমে কেটে গেছে তিরিশ বসন্ত, তবু
এখনো কেমন যেন হৃদয় টাটায়-
প্রতারক পুরুষেরা এখনো আঙুল ছুঁলে
পাথর শরীর বয়ে ঝরনার জল ঝরে।

এখনো কেমন যেন কল কল শব্দ শুনি
নির্জন বৈশাখে, মাঘ-চৈত্রে-
ভুল প্রেমে কেটে গেছে তিরিশ বসন্ত, তবু
বিশ্বাসের রোদে পুড়ে নিজেকে অঙ্গার করি।

প্রতারক পুরুষেরা একবার ডাকলেই
ভুলে যাই পেছনের সজল ভৈরবী
ভুলে যাই মেঘলা আকাশ, না-ফুরানো দীর্ঘ রাত।
একবার ডাকলেই
সব ভুলে পা বাড়াই নতুন ভুলের দিকে
একবার ভালোবাসলেই
সব ভুলে কেঁদে উঠি অমল বালিকা।

ভুল প্রেমে তিরিশ বছর গেল
সহস্র বছর যাবে আরো,
তবু বোধ হবে না নির্বোধ বালিকার।

ভয়

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

যদি এ চোখের জ্যোতি নিবে যায় তবে
কি হবে, কী হবে!
দূরপথে ঘুরে ঘুরে ঢের নদীবন
খুঁজে যাকে এই রাতে নিয়ে এলে মন
এখনো দেখিনি তাকে দেখিনি, এখন
যদি এ চোখের জ্যোতি নিবে যায় তবে
কি হবে, কী হবে!

সে-ও চলে যেতে পারে, যদি যায় তবে
কি হবে, কী হবে!
এই যে চোখের আলো, ব্যথাবেদনার
আগুনে রেখেছি তাকে জ্বেলে আমি, তার
দেখা পাওয়া যাবে, তাই! সে যদি আবার
চলে যায়, চোখভরা আলো নিয়ে তবে
কি হবে, কী হবে!

কখনো হারাই প্রাণ, কখনো প্রাণের
থেকেও যে প্রিয়তম, তাকে। সারাদিন
কথা মনে ছিলো কোনো মায়াবী গানের,
সুর খুঁজে পেয়ে তার বিষাদমলিন
কথাগুলি যদি ফের ভুলে যাই তবে
কি হবে, কী হবে!

ভালবাসা ক্রমসই নিন্মগামী হয়


আবিদ আনোয়ার

ভালবাসা ক্রমসই নিন্মগামী হয়-
একথা প্রথম শুনে সুসজ্জিত ঝোপের আড়ালে
তোমার আনত চোখে খেলেছিল চকিত বিস্ময়
বাড়তি কিছু অনাচারে রাঙামুখ হয়েছিল নীল;
মনে পড়ে বলেছিলে, ‘ছি ছি! তুমি এতটা অশ্লীল!’

কুমারী বুকের নিচে হয়তো কোন শান্ত জলাধার
ঢেউ হয়ে তুলেছিল রিরংসার প্রথম তোলপাড়;
ক্রমে ক্রমে বুঝে নিলে অশ্লীলতা বলে কিছু নেই-
পবিত্র ফুলের মতো উন্মোচিত হয়েছিলে প্রথম রাতেই।

যখন ফসল এল নিন্মাচারী আমাদের যৌথ চাষাবাদে
তুমি আমি সঞ্জীবিত পরিপূর্ণ জীবনের স্বাদে

সে ফসল নেই আজ-শূন্য ঘরদোর
কবেই ডাকাতি করে নিয়ে গেছে সময়ের চোর:
নিজেই জনক হয়ে যখন সে চুমু খায় আপন শিশুকে
ভাবেনা এ উঞ্চতায় সেও ছিল অন্য কারও বুকে।
কখনো বিস্ময়ে যদি বলে উঠি : এ আমার নিজের তনয়?
নিবিষ্ট গৃহিনী থেকে সহসাই দার্শনিক সেজে
ছুড়ে মারো বুমেরাং: ভালবাসা ক্রমশই নিন্মগামী হয়।

ভিক্ষা ও উপার্জন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বসুমতি, কেন তুমি এতই কৃপণা,
কত খোঁড়াখুঁড়ি করি পাই শস্যকণা।
দিতে যদি হয় দে মা, প্রসন্ন সহাস—
কেন এ মাথার ঘাম পায়েতে বহাস।
বিনা চাষে শস্য দিলে কী তাহাতে ক্ষতি?
শুনিয়া ঈষৎ হাসি কন বসুমতী,
আমার গৌরব তাহে সামান্যই বাড়ে,
তোমার গৌরব তাহে নিতান্তই ছাড়ে।

ভূমিহীন কৃষকের গান

হেলাল হাফিজ

দুই ইঞ্চি জায়গা হবে?
বহুদিন চাষাবাদ করিনা সুখের।

মাত্র ইঞ্চি দুই জমি চাই
এর বেশী কখনো চাবো না,
যুক্তিসঙ্গত এই জৈবনিক দাবি খুব বিজ্ঞানসম্মত
তবু ওটুকু পাবো না
এমন কী অপরাধ কখন করেছি!

ততোটা উর্বর আর সুমসৃণ না হলেও ক্ষতি নেই
ক্ষোভ নেই লাবন্যের পুষ্টিহীনতায়,
যাবতীয় সার ও সোহাগ দিয়ে
একনিষ্ঠ পরিচর্যা দিয়ে
যোগ্য করে নেবো তাকে কর্মিষ্ঠ কৃষকের মত।

একদিন দিন চলে যাবে মৌসুম ফুরাবে,
জরা আর খরায় পীড়িত খাঁ খাঁ
অকর্ষিত ওলো জমি
কেঁদে-কেটে কৃষক পাবে না।

ভাল রে ভাল

সুকুমার রায়

দাদা গো! দেখ্‌ছি ভেবে অনেক দূর---
এই দুনিয়ার সকল ভালো,
আসল ভালো নকল ভালো,
শস্তা ভালো দামীও ভালো,
তুমিও ভালো আমিও ভালো,
হেথায় গানের ছন্দ ভালো,
হেথায় ফুলের গন্ধ ভালো,
মেঘ-মাখানো আকাশ ভালো,
ঢেউ-জাগানো বাতাস ভালো,
গ্রীষ্ম ভালো বর্ষা ভালো,
ময়লা ভালো ফর্‌সা ভালো,
পোলাও ভালো কোর্মা ভালো,
মাছ-পটোলের দোল্‌মা ভালো,
কাঁচাও ভালো পাকাও ভালো,
সোজাও ভালো বাঁকাও ভালো,
কাঁসিও ভালো ঢাকও ভালো,
টিকিও ভালো টাকও ভালো,
ঠেলার গাড়ি ঠেল্‌তে ভালো,
খাস্তা লুচি বেল্‌তে ভালো,
গিট্‌কিরি গান শুনতে ভালো,
শিমূল তুলো ধুন্‌তে ভালো,
ঠাণ্ডা জলে নাইতে ভালো,
কিন্তু সবার চাইতে ভালো---
পাঁউরুটি আর ঝোলা গুড়।

ভেজাল

সুকান্ত ভট্টাচার্য

ভেজাল, ভেজাল ভেজাল রে ভাই, ভেজাল সারা দেশটায়,
ভেজাল ছাড়া খাঁটি জিনিষ মিলবে নাকো চেষ্টায়!
ভেজাল তেল আর ভেজাল চাল, ভেজাল ঘি আর ময়দা,
`কৌন ছোড়ে গা ভেজাল ভেইয়া, ভেজালসে হ্যায় ফয়দা।’
ভেজাল পোশাক ভেজাল খাবার, ভেজাল লোকের ভাবনা,
ভেজালেরই রাজত্ব এ পাটনা থেকে পাবনা।
ভেজাল কথা— বাংলাতে ইংরেজী ভেজাল চলছে,
ভেজাল দেওয়া সত্যি কথা লোকেরা আজ বলছে।
`খাঁটি জিনিষ’ এই কথাটা রেখো না আর চিত্তে,
`ভেজাল’ নামটা খাঁটি কেবল আর সকলই মিথ্যে।
কলিতে ভাই `ভেজাল’ সত্য ভেজাল ছাড়া গতি নেই,
ছড়াটাতেও ভেজাল দিলাম, ভেজাল দিলে ক্ষতি নেই॥

ভালবাসার জয়

যতীন্দ্র মোহন বাগচী

ও ভাই, ভয়কে মোরা জয় করিব হেসে-
গোলাগুলির গোলাতে নয়, গভীর ভালবেসে।
খড়ুগ, সায়ক, শাণিত তরবার,
কতটুকুন সাধ্য তাহার, কি বা তাহার ধার?
শত্রুকে সে জিনতে পারে, কিনতে নারে যে সে-
ও তার স্বভাব সর্বনেশে।
ভালবাসায় ভুবন করে জয়,
সখ্যে তাহার অশ্রুজলে শত্রু মিত্র হয়-
সে যে সৃজন পরিচয়।
শত আঘাত-ব্যথা-অপমানে লয় সে কোলে এসে,
মৃত্যুরে সে বন্ধু বলে ধরে শেষে।

ভর দুপুরে

আল মাহমুদ

মেঘনা নদীর শান্ত মেয়ে তিতাসে
মেঘের মত পাল উড়িয়ে কী ভাসে!
মাছের মত দেখতে এ কোন পাটুনি
ভর দুপুরে খাটছে সখের খাটুনি।
ওমা এ-যে কাজল বিলের বোয়ালে
পালের দড়ি আটকে আছে চোয়ালে
আসছে ধেয়ে লম্বা দাড়ি নাড়িয়ে,
ঢেউয়ের বাড়ি নাওয়ের সারি ছাড়িয়ে।

কোথায় যাবে কোন উজানে ও-মাঝি
আমার কোলে খোকন নামের যে-পাজি
হাসেছ, তারে নাও না তোমার নায়েতে
গাঙ-শুশুকের স্বপ্নভরা গাঁয়েতে;
সেথায় নাকি শালুক পাতার চাদরে
জলপিপিরা ঘুমায় মহা আদরে,
শাপলা ফুলের শীতল সবুজ পালিশে
থাকবে খোকন ঘুমিয়ে ফুলের বালিশে।

ভোলানাথ লিখেছিল

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভোলানাথ লিখেছিল ,
তিন-চারে নব্বই —
গণিতের মার্কায়
কাটা গেল সর্বই ।
তিন চারে বারো হয় ,
মাস্টার তারে কয় ;
‘ লিখেছিনু ঢের বেশি '
এই তার গর্বই ।

[খাপছাড়া]

ভাতদে হারামজাদা

রফিক আজাদ

ভীষণ ক্ষুধার্ত আছিঃ উদরে, শরীরবৃত্ত ব্যেপে
অনুভূত হতে থাকে- প্রতিপলে- সর্বগ্রাসী ক্ষুধা
অনাবৃষ্টি- যেমন চৈত্রের শষ্যক্ষেত্রে- জ্বেলে দ্যায়
প্রভুত দাহন- তেমনি ক্ষুধার জ্বালা, জ্বলে দেহ
দু’বেলা দু’মুঠো পেলে মোটে নেই অন্য কোন দাবী
অনেকে অনেক কিছু চেয়ে নিচ্ছে, সকলেই চায়ঃ