কবি-পরিচিতি কামিনী রায় ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বরিশার জেলার বাসন্ডা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। উনিশ শতকের শেষ দিকে যে কজন বিশিষ্ট মহিলা কবির সাক্ষাত মেলে, তাদের মধ্যে কামিনী রায় অন্যতম । ১৮৮০ খ্রীস্টাব্দে তিনি কলকাতা বেথুন স্কুল হতে এন্ট্রান্স (মাধ্যমিক) পরীক্ষা ও ১৮৮৩ খ্রীস্টাব্দে এফ.এ বা ফার্স্ট আর্টস (উচ্চ মাধ্যমিক সমমানের) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বেথুন কলেজ হতে তিনি ১৮৮৬ খ্রীস্টাব্দে ভারতের প্রথম নারী হিসাবে সংস্কৃত ভাষায় সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন।
তাঁর কবিতা পড়ে বিমোহিত হন সিবিলিয়ান কেদারনাথ রায় এবং তাঁকে বিয়ে করেন। ১৯০৯ খ্রীস্টাব্দে কামিনী রায়ের স্বামীর অপঘাতে মৃত্যু ঘটেছিল। সেই শোক ও দুঃখ তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে, যা তাঁর কবিতায় প্রকাশ পায়। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সংস্কৃত সাহিত্য দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে -আলো ও ছায়া (১৮৮৯), নির্মাল্য (১৮৯১), মাল্য ও নির্মাল্য (১৯১৩), দীপ ও ধূপ (১৯২৯), জীবন পথে (১৯৩০) ।
জীবনের শেষ ভাগে তিনি হাজারীবাগে বাস করেছেন। ২৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৩ খ্রীস্টাব্দে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
Showing posts with label alk039. Show all posts
Showing posts with label alk039. Show all posts
কামিনী রায়
সুখ
কামিনী রায়
["আলো ও ছায়া" থেকে নেওয়া ]
নাই কিরে সুখ? নাই কিরে সুখ?---
এ ধরা কি শুধু বিষাদময়?
যতনে জ্বলিয়া কাঁদিয়া মরিতে
কেবলি কি নর জনম লয়?---
["আলো ও ছায়া" থেকে নেওয়া ]
নাই কিরে সুখ? নাই কিরে সুখ?---
এ ধরা কি শুধু বিষাদময়?
যতনে জ্বলিয়া কাঁদিয়া মরিতে
কেবলি কি নর জনম লয়?---
দিন চলে যায়
কামিনী রায়
["আলো ও ছায়া" থেকে নেওয়া ]
একে একে একে হায়! দিনগুলি চলে যায়,
কালের প্রবাহ পরে প্রবাহ গড়ায়,
সাগরে বুদ্বুদ্ মত উন্মত্ত বাসনা যত
হৃদয়ের আশা শত হৃদয়ে মিলায়,
আর দিন চলে যায় ।
জীবনে আঁধার করি, কৃতান্ত সে লয় হরি
প্রাণাধিক প্রিয়জনে, কে নিবারে তায়?
শিথির হৃদয় নিয়ে, নর শূণ্যালয়ে গিয়ে,
জীবনের বোঝা লয় তুলিয়া মাথায়,
আর দিন চলে যায় ।
নিশ্বাস নয়নজল মানবের শোকানল
একটু একটু করি ক্রমশঃ নিবায়,
স্মৃতি শুধু জেগে রহে, অতীত কাহিনী কহে,
লাগে গত নিশীথের স্বপনের প্রায় ;
আর দিন চলে যায়!
একে একে একে হায়! দিনগুলি চলে যায়,
কালের প্রবাহ পরে প্রবাহ গড়ায়,
সাগরে বুদ্বুদ্ মত উন্মত্ত বাসনা যত
হৃদয়ের আশা শত হৃদয়ে মিলায়,
আর দিন চলে যায় ।
জীবনে আঁধার করি, কৃতান্ত সে লয় হরি
প্রাণাধিক প্রিয়জনে, কে নিবারে তায়?
শিথির হৃদয় নিয়ে, নর শূণ্যালয়ে গিয়ে,
জীবনের বোঝা লয় তুলিয়া মাথায়,
আর দিন চলে যায় ।
নিশ্বাস নয়নজল মানবের শোকানল
একটু একটু করি ক্রমশঃ নিবায়,
স্মৃতি শুধু জেগে রহে, অতীত কাহিনী কহে,
লাগে গত নিশীথের স্বপনের প্রায় ;
আর দিন চলে যায়!
ডেকে আন্
কামিনী রায়
["আলো ও ছায়া" থেকে নেওয়া ]
পথ ভুলে গিয়াছিল, আবার এসেছে ফিরে,
দাঁড়ায়ে রয়েছে দূরে, লাজে ভয়ে নত শিরে ;
সম্মুখে চলে না পদ, তুলিতে পারে না আঁখি,
কছে গিয়ে, হাত ধরে, ওরে তারে আন্ ডাকি।
ফিরস্ নে মুখ আজ নীরব ধিক্কার করি,
আজি আন্ স্নেহ-সুধা লোচন বচন ভরি।
অতীতে বরষি ঘৃণা কিবা আর হবে ফল?
আঁধার ভবিষ্য ভাবি, হাত ধরে লয়ে চল্।
স্নেহের অভাবে পাছে এই লজ্জানত প্রাণ
সঙ্কোচ হারায়ে ফেলে---আন্ ওরে ডেকে আন্!
আসিয়াছে ধরা দিতে, শত স্নেহ-বাহু-পাশে
বেঁধে ফেল্ ; আজ গেলে আর যদি না-ই আসে ।
দিনেকের অবহেলা, দিনেকের ঘৃণাক্রোধ,
একটি জীবন তোরা হারাবি জীবন-শোধ ।
তোরা কি জীবন দিবি? উপেক্ষা যে বিষবাণ,
দুঃখ-ভরা ক্ষমা লয়ে, আন্, ওরে ডেকে আন্।
["আলো ও ছায়া" থেকে নেওয়া ]
পথ ভুলে গিয়াছিল, আবার এসেছে ফিরে,
দাঁড়ায়ে রয়েছে দূরে, লাজে ভয়ে নত শিরে ;
সম্মুখে চলে না পদ, তুলিতে পারে না আঁখি,
কছে গিয়ে, হাত ধরে, ওরে তারে আন্ ডাকি।
ফিরস্ নে মুখ আজ নীরব ধিক্কার করি,
আজি আন্ স্নেহ-সুধা লোচন বচন ভরি।
অতীতে বরষি ঘৃণা কিবা আর হবে ফল?
আঁধার ভবিষ্য ভাবি, হাত ধরে লয়ে চল্।
স্নেহের অভাবে পাছে এই লজ্জানত প্রাণ
সঙ্কোচ হারায়ে ফেলে---আন্ ওরে ডেকে আন্!
আসিয়াছে ধরা দিতে, শত স্নেহ-বাহু-পাশে
বেঁধে ফেল্ ; আজ গেলে আর যদি না-ই আসে ।
দিনেকের অবহেলা, দিনেকের ঘৃণাক্রোধ,
একটি জীবন তোরা হারাবি জীবন-শোধ ।
তোরা কি জীবন দিবি? উপেক্ষা যে বিষবাণ,
দুঃখ-ভরা ক্ষমা লয়ে, আন্, ওরে ডেকে আন্।
মাতৃপূজা
কামিনী রায়
যেইদিন ও চরণে ডালি দিনু এ জীবন,
হাসি অশ্রু সেইদিন করিয়াছি বিসর্জন।
হাসিবার কাঁদিবার অবসর নাহি আর,
দুঃখিনী জনম-ভূমি,---মা আমার, মা আমার!
অনল পুষিতে চাহি আপনির হিয়া মাঝে,
আপনারে অপরেরে নিয়োজিতে তব কাজে ;
ছোটখাটো সুখ-দুঃখ---কে হিসাব রাখে তার
তুমি যবে চাহ কাজ,---মা আমার, মা আমার!
অতীতের কথা কহি' বর্তমান যদি যায়,
সে কথাও কহিব না, হৃদয়ে জপিব তায় ;
গাহি যদি কোন গান, গাব তবে অনিবার,
মরিব তোমারি তরে,---মা আমার, মা আমার!
মরিব তোমারি কাজে, বাঁচিব তোমারি তরে,
নহিলে বিষাদময় এ জীবন কেবা ধরে?
যতদিন না ঘুচিবে তোমার কলঙ্ক-ভার,
থাক্ প্রাণ, যাক্ প্রাণ,---মা আমার, মা আমার!
যেইদিন ও চরণে ডালি দিনু এ জীবন,
হাসি অশ্রু সেইদিন করিয়াছি বিসর্জন।
হাসিবার কাঁদিবার অবসর নাহি আর,
দুঃখিনী জনম-ভূমি,---মা আমার, মা আমার!
অনল পুষিতে চাহি আপনির হিয়া মাঝে,
আপনারে অপরেরে নিয়োজিতে তব কাজে ;
ছোটখাটো সুখ-দুঃখ---কে হিসাব রাখে তার
তুমি যবে চাহ কাজ,---মা আমার, মা আমার!
অতীতের কথা কহি' বর্তমান যদি যায়,
সে কথাও কহিব না, হৃদয়ে জপিব তায় ;
গাহি যদি কোন গান, গাব তবে অনিবার,
মরিব তোমারি তরে,---মা আমার, মা আমার!
মরিব তোমারি কাজে, বাঁচিব তোমারি তরে,
নহিলে বিষাদময় এ জীবন কেবা ধরে?
যতদিন না ঘুচিবে তোমার কলঙ্ক-ভার,
থাক্ প্রাণ, যাক্ প্রাণ,---মা আমার, মা আমার!
প্রণয়ে ব্যথা
কামিনী রায়
["আলো ও ছায়া" থেকে নেওয়া ]
কেন যন্ত্রণার কথা, কেন নিরাশা ব্যথা,
জড়িত রহিল ভবে ভালবাসা সাথে?
কেন এত হাহাকার, , এত ঝরে অশ্রু ধার?
কেন কণ্টকের কূপ প্রণয়ের পথে?
বিস্তীর্ণ প্রান্তর মাঝে , প্রাণ এক যবে খোঁজে
আকুল ব্যাকুল হয়ে সাথী একজন,
ভ্রমি বহু, অতি দূরে , পায় যবে দেখিবারে
একটি পথিক-প্রাণ মনেরি মতন ;---
তখন, তখন তারে , নিয়তি কেনরে বারে,
কেন না মিশাতে দেয় দুইটি জীবন?
অনুলঙ্ঘ্য বাধা রাশি , সম্মুখে দাঁড়ায় আসি---
কেন দুই দিকে আহা যায় দুই জন?
অথবা, একটি প্রাণ , আপনারে করে দান---
আপনারে দেয় ফেলে' অপরের পায় ;
সে না বারেকের তরে , ভুলেও ভ্রুক্ষেপ করে,
সবলে চরণতলে দলে' চলে' যায় ।
নৈরাশপূরিত ভবে , শুভযুগ কবে হবে,
এরটি প্রাণের তরে আর একটি প্রাণ
কাঁদিবে না সারা পথে ;--- , প্রণয়ের মনোরথে
স্বর্গমর্ত্যে কেহ নাহি দিবে বাধা দান?
কেন যন্ত্রণার কথা, কেন নিরাশা ব্যথা,
জড়িত রহিল ভবে ভালবাসা সাথে?
কেন এত হাহাকার, , এত ঝরে অশ্রু ধার?
কেন কণ্টকের কূপ প্রণয়ের পথে?
বিস্তীর্ণ প্রান্তর মাঝে , প্রাণ এক যবে খোঁজে
আকুল ব্যাকুল হয়ে সাথী একজন,
ভ্রমি বহু, অতি দূরে , পায় যবে দেখিবারে
একটি পথিক-প্রাণ মনেরি মতন ;---
তখন, তখন তারে , নিয়তি কেনরে বারে,
কেন না মিশাতে দেয় দুইটি জীবন?
অনুলঙ্ঘ্য বাধা রাশি , সম্মুখে দাঁড়ায় আসি---
কেন দুই দিকে আহা যায় দুই জন?
অথবা, একটি প্রাণ , আপনারে করে দান---
আপনারে দেয় ফেলে' অপরের পায় ;
সে না বারেকের তরে , ভুলেও ভ্রুক্ষেপ করে,
সবলে চরণতলে দলে' চলে' যায় ।
নৈরাশপূরিত ভবে , শুভযুগ কবে হবে,
এরটি প্রাণের তরে আর একটি প্রাণ
কাঁদিবে না সারা পথে ;--- , প্রণয়ের মনোরথে
স্বর্গমর্ত্যে কেহ নাহি দিবে বাধা দান?
সে কি ?
কামিনী রায়
["আলো ও ছায়া" থেকে নেওয়া ]
"প্রণয়?"
"ছি!"
"ভালবাসা---প্রেম?"
"তাও নয় ।"
"সে কি তবে?"
"দিও নাম, দিই পরিচয়---
আসক্তি বিহীন শুদ্ধ ঘন অনুরাগ,
আনন্দ সে নাহি তাহে পৃথিবীর দাগ ;
আছে গভীরতা আর উদ্বেল উচ্ছ্বাস,
দু'ধারে সংযম-বেলা, ঊর্দ্ধে নীল আকাশ,
উজ্জ্বল কৌমুদীতলে অনাবৃত প্রাণ,
বিম্ব প্রতিবিম্ব কার প্রাণে অধিষ্ঠান ;
ধরার মাঝারে থাকি ধরা ভুলে যাওয়া,
উন্নত-কামনা-ভরে ঊর্দ্ধ দিকে চাওয়া ;
পবিত্র পরশে যার, মলিন হৃদয়,
আপনাতে প্রতিষ্ঠিত করে দেবালয়,
ভকতি বিহ্বল, প্রিয় দেব-প্রতিমারে
প্রণমিয়া দূরে রহে, নারে ছুঁইবারে ;
আলোকের আলিঙ্গনে, আঁধারের মত,
বাসনা হারায়ে যায়, দুঃখ পরাহত ;
জীবন কবিতা-গীতি, নহে আর্তনাদ,
চঞ্চল নিরাশা, আশা, হর্ষ, অবসাদ।
আপনার বিকাইয়া আপনাতে বাস,
আত্মার বিস্তার ছিঁড়ি' ধরণীর পাশ।
হৃদয়-মাধুরী সেই, পূণ্য তেজোময়,
সে কি তোমাদের প্রেম?---কখনই নয়।
শত মুখে উচ্চারিত, কত অর্থ যার,
সে নাম দিও না এরে মিনতি আমার।"
["আলো ও ছায়া" থেকে নেওয়া ]
"প্রণয়?"
"ছি!"
"ভালবাসা---প্রেম?"
"তাও নয় ।"
"সে কি তবে?"
"দিও নাম, দিই পরিচয়---
আসক্তি বিহীন শুদ্ধ ঘন অনুরাগ,
আনন্দ সে নাহি তাহে পৃথিবীর দাগ ;
আছে গভীরতা আর উদ্বেল উচ্ছ্বাস,
দু'ধারে সংযম-বেলা, ঊর্দ্ধে নীল আকাশ,
উজ্জ্বল কৌমুদীতলে অনাবৃত প্রাণ,
বিম্ব প্রতিবিম্ব কার প্রাণে অধিষ্ঠান ;
ধরার মাঝারে থাকি ধরা ভুলে যাওয়া,
উন্নত-কামনা-ভরে ঊর্দ্ধ দিকে চাওয়া ;
পবিত্র পরশে যার, মলিন হৃদয়,
আপনাতে প্রতিষ্ঠিত করে দেবালয়,
ভকতি বিহ্বল, প্রিয় দেব-প্রতিমারে
প্রণমিয়া দূরে রহে, নারে ছুঁইবারে ;
আলোকের আলিঙ্গনে, আঁধারের মত,
বাসনা হারায়ে যায়, দুঃখ পরাহত ;
জীবন কবিতা-গীতি, নহে আর্তনাদ,
চঞ্চল নিরাশা, আশা, হর্ষ, অবসাদ।
আপনার বিকাইয়া আপনাতে বাস,
আত্মার বিস্তার ছিঁড়ি' ধরণীর পাশ।
হৃদয়-মাধুরী সেই, পূণ্য তেজোময়,
সে কি তোমাদের প্রেম?---কখনই নয়।
শত মুখে উচ্চারিত, কত অর্থ যার,
সে নাম দিও না এরে মিনতি আমার।"
চন্দ্রাপীড়ের জাগরণ
কামিনী রায়
["আলো ও ছায়া" থেকে নেওয়া ]
অন্ধকার মরণের ছায়
কতকাল প্রণয়ী ঘুমায়?---
চন্দ্রাপীড়, জাগ এইবার।
বসন্তের বেলা চলে যায়,
বিহগেরা সান্ধ্যগীত গায়,
প্রিয়া তবু মুছে অশ্রুধার।
মাস, বর্ষ হ'ল অবসান,
আশা-বাঁধা ভগ্ন পরাণ
নয়নেরে করেছে শাসন,
কোনদিন ফেলি অশ্রুজল,
করিবে না প্রিয়-অমঙ্গল---
এই তার আছিল যে পণ।
আজি ফুল মলয়জ দিয়া,
শুভ্র-দেহা, শুভ্রতর দিয়া,
পূজিয়াছে প্রণয়ের দেবে ;
নবীভূত আশারাশি তার,
অশ্রুমালা শোনে নাকো আর---
চন্দ্রাপীড়, মেল আঁখি এবে।
দেখ চেয়ে, সিক্তোত্পল দুটি
তোমা পানে রহিয়াছে ফুটি,
যেন সেই নেত্র-পথ দিয়া,
জীবন, তেয়াগি নিজকায়,
তোমারি অন্তরে যেতে চায়---
তাই হোক্, উঠ গো বাঁচিয়া।
প্রণয় সে আত্মার চেতন,
জীবনের জনম নূতন,
মরণের মরণ সেথায়।
চন্দ্রাপীড়, ঘুমা'ও না আর---
কানে কানে কে কহিল কার,
আঁখি মেলি চন্দ্রাপীড় চায়।
মৃত্যু-মোহ অই ভেঙ্গে যায়,
স্বপ্ন তার চেতনে মিশায়,
চারি নেত্র শুভ দরশন
একদৃষ্টে কাদম্বরী চায়,
নিমেষ ফেলিতে ভয় পায়---
"এতো স্বপ্ন---নহে জাগরণ।"
নয়ন ফিরাতে ভয় পায়,
এ স্বপন পাছে ভেঙ্গে যায়,
প্রাণ যেন ওঠে উথলিয়া।
আঁখি দুটি মুখ চেয়ে থাক্,
জীবন স্বপন হয়ে যাক্,
অতীতের বেদনা ভুলিয়া।
"আধেক স্বপনে, প্রিয়ে,
কাটিয়া গিয়াছে নিশি,
মধুর আধেক আর
জাগরণে আছে মিশি ;"
"মরণে অবসানে
জীবন জনম প্রায়।"
"জীবন?---জীবন, প্রিয়?
নহি স্বপনের মোহ?
মরণের কোন্ তীরে
অবতীর্ণ আজ দোঁহে?"
["আলো ও ছায়া" থেকে নেওয়া ]
অন্ধকার মরণের ছায়
কতকাল প্রণয়ী ঘুমায়?---
চন্দ্রাপীড়, জাগ এইবার।
বসন্তের বেলা চলে যায়,
বিহগেরা সান্ধ্যগীত গায়,
প্রিয়া তবু মুছে অশ্রুধার।
মাস, বর্ষ হ'ল অবসান,
আশা-বাঁধা ভগ্ন পরাণ
নয়নেরে করেছে শাসন,
কোনদিন ফেলি অশ্রুজল,
করিবে না প্রিয়-অমঙ্গল---
এই তার আছিল যে পণ।
আজি ফুল মলয়জ দিয়া,
শুভ্র-দেহা, শুভ্রতর দিয়া,
পূজিয়াছে প্রণয়ের দেবে ;
নবীভূত আশারাশি তার,
অশ্রুমালা শোনে নাকো আর---
চন্দ্রাপীড়, মেল আঁখি এবে।
দেখ চেয়ে, সিক্তোত্পল দুটি
তোমা পানে রহিয়াছে ফুটি,
যেন সেই নেত্র-পথ দিয়া,
জীবন, তেয়াগি নিজকায়,
তোমারি অন্তরে যেতে চায়---
তাই হোক্, উঠ গো বাঁচিয়া।
প্রণয় সে আত্মার চেতন,
জীবনের জনম নূতন,
মরণের মরণ সেথায়।
চন্দ্রাপীড়, ঘুমা'ও না আর---
কানে কানে কে কহিল কার,
আঁখি মেলি চন্দ্রাপীড় চায়।
মৃত্যু-মোহ অই ভেঙ্গে যায়,
স্বপ্ন তার চেতনে মিশায়,
চারি নেত্র শুভ দরশন
একদৃষ্টে কাদম্বরী চায়,
নিমেষ ফেলিতে ভয় পায়---
"এতো স্বপ্ন---নহে জাগরণ।"
নয়ন ফিরাতে ভয় পায়,
এ স্বপন পাছে ভেঙ্গে যায়,
প্রাণ যেন ওঠে উথলিয়া।
আঁখি দুটি মুখ চেয়ে থাক্,
জীবন স্বপন হয়ে যাক্,
অতীতের বেদনা ভুলিয়া।
"আধেক স্বপনে, প্রিয়ে,
কাটিয়া গিয়াছে নিশি,
মধুর আধেক আর
জাগরণে আছে মিশি ;"
"মরণে অবসানে
জীবন জনম প্রায়।"
"জীবন?---জীবন, প্রিয়?
নহি স্বপনের মোহ?
মরণের কোন্ তীরে
অবতীর্ণ আজ দোঁহে?"
পুষ্প-প্রভঞ্জন
কামিনী রায়
["মাল্য ও নির্মাল্য" থেকে নেওয়া ]
লঙ্ঘি কোন্ সাগর উত্তাল,
এলে তুমি ভীম প্রভঞ্জন,
ঘন কৃষ্ণ মেঘ-জটা-জাল
আবরিছে অদৃশ্য আনন।
বিদ্যুৎ হানিছে দৃষ্টি তব,
অশনি কহিছে রোধ বাক্,
আজ আমি নতশিরে রব,
ওষ্ঠাধর আজ রুদ্ধ থাক।
আছাড়ি, আস্ফালি, চূর্ণ করি,
শ্রান্ত হয়ে করিবে শয়ন,
নিদ্রা শেষে শান্ত রূপ ধরি
সম্ভাষিবে প্রসন্ন নয়ন।
চুমা দিবে আমার আঁখিতে,
দুলাইবে চূর্ণালোকগুলি,
হাসি আমি নারিব ঢাকিতে,
আধর আপনি যাবে খুলি।
আপনি আসিবে বাহিরিয়া
হৃদয়ের নিভৃত সুবাস,
তুমি মোরে ঘিরিয়া ঘিরিয়া
ফেলিবে অতৃপ্ত দীর্ঘশ্বাস।
কাল দিব রূপ গন্ধ রস,
মেঘ বৃষ্টি হইলে অতীত,
অরূপের মৃদুল পরশ
আমারে করিবে পুলকিত।
["মাল্য ও নির্মাল্য" থেকে নেওয়া ]
লঙ্ঘি কোন্ সাগর উত্তাল,
এলে তুমি ভীম প্রভঞ্জন,
ঘন কৃষ্ণ মেঘ-জটা-জাল
আবরিছে অদৃশ্য আনন।
বিদ্যুৎ হানিছে দৃষ্টি তব,
অশনি কহিছে রোধ বাক্,
আজ আমি নতশিরে রব,
ওষ্ঠাধর আজ রুদ্ধ থাক।
আছাড়ি, আস্ফালি, চূর্ণ করি,
শ্রান্ত হয়ে করিবে শয়ন,
নিদ্রা শেষে শান্ত রূপ ধরি
সম্ভাষিবে প্রসন্ন নয়ন।
চুমা দিবে আমার আঁখিতে,
দুলাইবে চূর্ণালোকগুলি,
হাসি আমি নারিব ঢাকিতে,
আধর আপনি যাবে খুলি।
আপনি আসিবে বাহিরিয়া
হৃদয়ের নিভৃত সুবাস,
তুমি মোরে ঘিরিয়া ঘিরিয়া
ফেলিবে অতৃপ্ত দীর্ঘশ্বাস।
কাল দিব রূপ গন্ধ রস,
মেঘ বৃষ্টি হইলে অতীত,
অরূপের মৃদুল পরশ
আমারে করিবে পুলকিত।
কর্তব্যের অন্তরায়
["মাল্য ও নির্মাল্য" থেকে নেওয়া]
কে তুমি দাঁড়ায়ে কর্তব্যের পথে,
সময় হরিছ মোর ;
কে তুমি আমার জীবন ঘিরিয়া
জড়ালে স্নেহের ডোর,
চির-নিদ্রাহীন নয়নে আমার
আনিছ ঘুমের ঘোর?
দু'নয়ন হ'তে দূরস্থ আলোকে
কেন কর অন্তরাল?
কেমনে লভিব লক্ষ্য জীবনের
পথে কাটাইলে কাল?
আমার রয়েছে কঠোর সাধনা,
ফেলনা মায়ার জাল।
তোমারে দেখিলে গত অনাগত
যাই একেবারে ভুলে
মুগ্ধ হিয়া মম চাহে লুটাইতে
তোমার চরণমূলে,
ফেলে যাও তারে, দলে যাও তারে,
নিওনা, নিওনা তু'লে।
তোমার মমতা অকল্যাণময়ী,
তোমার প্রণয় ক্রূর,
যদি লয়ে যায় ভুলাইয়া পথ,
লয়ে যাবে কত দূর?
এই স্বপ্নাবেশ রহিবার নয়,
চলে যাও হে নিষ্ঠুর।
কে তুমি দাঁড়ায়ে কর্তব্যের পথে,
সময় হরিছ মোর ;
কে তুমি আমার জীবন ঘিরিয়া
জড়ালে স্নেহের ডোর,
চির-নিদ্রাহীন নয়নে আমার
আনিছ ঘুমের ঘোর?
দু'নয়ন হ'তে দূরস্থ আলোকে
কেন কর অন্তরাল?
কেমনে লভিব লক্ষ্য জীবনের
পথে কাটাইলে কাল?
আমার রয়েছে কঠোর সাধনা,
ফেলনা মায়ার জাল।
তোমারে দেখিলে গত অনাগত
যাই একেবারে ভুলে
মুগ্ধ হিয়া মম চাহে লুটাইতে
তোমার চরণমূলে,
ফেলে যাও তারে, দলে যাও তারে,
নিওনা, নিওনা তু'লে।
তোমার মমতা অকল্যাণময়ী,
তোমার প্রণয় ক্রূর,
যদি লয়ে যায় ভুলাইয়া পথ,
লয়ে যাবে কত দূর?
এই স্বপ্নাবেশ রহিবার নয়,
চলে যাও হে নিষ্ঠুর।
মুগ্ধ প্রণয়
কামিনী রায়
সে কি কথা---যারে চেয়েছিলে
পাও নাই সন্ধান তাহার?
কারে বলে' কার গলে দিলে
প্রণয়ের পারিজাত হার?
মুগ্ধ নর ; আঁখি ছলে মন ;
কল্পনা সে বাস্তবের ছায় ;
চারু মূর্তি করিয়া গঠন,
শিল্পী ভাল বেসেছিলে তায়।
স্বরচিত প্রতিমার তরে
উন্মত্ত হইল যবে প্রাণ,
দেবতারে কহিল কাতরে---
পাষাণে জীবন কর দান।
প্রেমময় বিধাতার বরে
সে বাসনা পূর্ণ হ'ল তার---
অনুভূতি কঠোর প্রস্তরে,
প্রতিমায় জীবন সঞ্চার।
পাষাণের প্রতিমাটি যবে
প্রাণময়ী নারীরূপ ধরে,
নারী তবে পাবে না কি তবে
দেবী হ'তে বিধাতার বরে?
সে কি কথা---যারে চেয়েছিলে
পাও নাই সন্ধান তাহার?
কারে বলে' কার গলে দিলে
প্রণয়ের পারিজাত হার?
মুগ্ধ নর ; আঁখি ছলে মন ;
কল্পনা সে বাস্তবের ছায় ;
চারু মূর্তি করিয়া গঠন,
শিল্পী ভাল বেসেছিলে তায়।
স্বরচিত প্রতিমার তরে
উন্মত্ত হইল যবে প্রাণ,
দেবতারে কহিল কাতরে---
পাষাণে জীবন কর দান।
প্রেমময় বিধাতার বরে
সে বাসনা পূর্ণ হ'ল তার---
অনুভূতি কঠোর প্রস্তরে,
প্রতিমায় জীবন সঞ্চার।
পাষাণের প্রতিমাটি যবে
প্রাণময়ী নারীরূপ ধরে,
নারী তবে পাবে না কি তবে
দেবী হ'তে বিধাতার বরে?
কর'না জিজ্ঞাসা
কামিনী রায়
মোরে প্রিয় কর'না জিজ্ঞাসা,
সুখে আমি আছি কি না আছি ।
ডরি আমি রসনার ভাষা ;
দোঁহে যবে এত কাছাকাছি,
মাঝখানে ভাষা কেন চাই ;
বুঝবার আর কিছু নাই ?
হাত মোর বাঁধা তব হাতে,
শ্রান্ত শির তব স্কন্ধোপরি,
জানিনা এ সুস্নিগ্ধ সন্ধ্যাতে
অশ্রু যেন ওঠে আঁখি ভরি ।
দুঃখ নয়, ইহা দুঃখ নয়,
এইটুকু জানিও নিশ্চয় ।
নীলাকাশে ফুটিতেছে তারা,
জাতি যুথী পল্লব হরিতে ;
অতি শুভ্র, অত্যুজ্জ্বল যারা,
আসে চলি আঁধার তরীতে ।
ভেসে আজ নয়নের জলে
কি আসিছে, কে আমারে বলে ?
(২)
সুখ সে কেমন যাদুকর,
তাকাইলে হয় অন্তর্ধান,
ডাকিলে সে দেয় না উত্তর,
চাহিলে সে করে না তো দান।
দুঃখ যে হইলে অতীত
সুখ বলি হয়গো প্রতীত !
সুখ সাথে আছে, কি না আছে,
কোন নাই প্রশ্ন মিমাংশার,
চলিছে সে পার্শ্বে কিবা পাছে ;
সুখ দুঃখ চেনা বড় ভার ;
আমরা দুজনে দু'জনার,
পিছে পাছে দৃষ্টি কেন আর ?
ওগো প্রিয় মোর মনে হয়,
প্রেম যদি থাকে মাঝখানে,
আনন্দ সে দূরে নাহি রয়।
প্রাণ যবে মিলে যায় প্রাণে,
সঙ্গীতে আলোকে পায় লয়,
যত ভয়, যতেক সংশয়।
মোরে প্রিয় কর'না জিজ্ঞাসা,
সুখে আমি আছি কি না আছি ।
ডরি আমি রসনার ভাষা ;
দোঁহে যবে এত কাছাকাছি,
মাঝখানে ভাষা কেন চাই ;
বুঝবার আর কিছু নাই ?
হাত মোর বাঁধা তব হাতে,
শ্রান্ত শির তব স্কন্ধোপরি,
জানিনা এ সুস্নিগ্ধ সন্ধ্যাতে
অশ্রু যেন ওঠে আঁখি ভরি ।
দুঃখ নয়, ইহা দুঃখ নয়,
এইটুকু জানিও নিশ্চয় ।
নীলাকাশে ফুটিতেছে তারা,
জাতি যুথী পল্লব হরিতে ;
অতি শুভ্র, অত্যুজ্জ্বল যারা,
আসে চলি আঁধার তরীতে ।
ভেসে আজ নয়নের জলে
কি আসিছে, কে আমারে বলে ?
(২)
সুখ সে কেমন যাদুকর,
তাকাইলে হয় অন্তর্ধান,
ডাকিলে সে দেয় না উত্তর,
চাহিলে সে করে না তো দান।
দুঃখ যে হইলে অতীত
সুখ বলি হয়গো প্রতীত !
সুখ সাথে আছে, কি না আছে,
কোন নাই প্রশ্ন মিমাংশার,
চলিছে সে পার্শ্বে কিবা পাছে ;
সুখ দুঃখ চেনা বড় ভার ;
আমরা দুজনে দু'জনার,
পিছে পাছে দৃষ্টি কেন আর ?
ওগো প্রিয় মোর মনে হয়,
প্রেম যদি থাকে মাঝখানে,
আনন্দ সে দূরে নাহি রয়।
প্রাণ যবে মিলে যায় প্রাণে,
সঙ্গীতে আলোকে পায় লয়,
যত ভয়, যতেক সংশয়।
ধরায় দেবতা চাহি
কামিনী রায়
ত্রিদিবে দেবতা নাও যদি থাকে ধরায় দেবতা চাহি গো চাহি,
মানব সবাই নয় গো মানব, কেহ বা দৈত্য, কেহ বা দানব,
উত্পীড়ন করে দুর্বল নরে, তাদের তরে যে ভরসা নাহি---
ধরায় দেবের প্রতিষ্ঠা চাহি।।
সেকালে দেবতা গোলক তেয়াগি, মাটির ধরায় মরের গেহে,
লইত জনম নর-শিশুরূপে, বাড়িয়া উঠিত নারীর স্নেহে ;
ধূলা বালু লয়ে খেলিয়া বেড়াত আর দশজন শিশুর মত ;---
আসিলে সময় দৈব বলে বলী, দানবে দলিতে যাইত সে চলি,
হেলায় সংহারি দুরাচারগণে, নিরাতঙ্ক করি সাধুসজ্জনে,
ফিরিয়া আসিত অপরাহত।।
ত্রিদিব তেয়াগি আসে কি না আসে, নরের আলয়ে নারীর কোলে,
আজিও দেবতা নর-জন্ম লয়, ধরণীর গ্লানি ম্লানি করি ক্ষয়,
আলোকের দিকে টানিয়া তোলে।।
ঐশ্বর্য আরাম চাহে ভুলাইতে, স্নেহ প্রেম কত বাঁধিতে চায়,
মাতা কাঁদে, জায়া শিশু দেয় কোলে সকল বাঁধন কাটিয়া যায়।।
বাহিরে বাতাসে যেই আর্তনাদ, যে রোদন ধ্বনি বহিয়া যায়,
শুনিতে শুনিতে অভ্যাসবশে সকলে যাহা না শুনিতে পায়---
তাই ডেকে লয় নর-দেবতায় সংগ্রামে পশিতে দানব সাথে,
দানব-সংহার মানবেরি কাজ, দধীচির হাড় ইন্দ্রের হাতে
বজ্র হয়ে আছে, রবে চিরদিন, মানবেরে দিয়া দেবের জয়,
ত্রিদিবে দেবতা নাও যদি থাকে ধরায় দেবতা নহিলে নয়।।
স্মৃতিচিহ্ন
কামিনী রায়
ওরা ভেবেছিল মনে আপনার নাম
মনোহর হর্ম্মরূপে বিশাল অক্ষরে
ইষ্টক প্রস্তরে রচি চিরদিন তরে
রেখে যাবে ! মূঢ় ওরা, ব্যর্থ মনস্কাম।
প্রস্তর খসিয়াছে ভূমে প্রস্তরের পরে,
চারিদিকে ভগ্নস্তূপ, তাহাদের তলে
লুপ্ত স্মৃতি ; শুষ্ক তৃণ কাল-নদী-জলে
ভেসে যায় নামগুলি, কেবা রক্ষা করে!
মানব হৃদয় ভুমি করি অধিকার,
করেছে প্রতিষ্ঠা যারা দৃঢ় সিংহাসন,
দরিদ্র আছিল তারা, ছিল না সম্বল
প্রস্তরের এত বোঝা জড় করিবার ;
তাদের রাজত্ব হের অক্ষুণ্ণ কেমন
কাল স্রোতে ধৌত নাম নিত্যসমুজ্জ্বল।
ওরা ভেবেছিল মনে আপনার নাম
মনোহর হর্ম্মরূপে বিশাল অক্ষরে
ইষ্টক প্রস্তরে রচি চিরদিন তরে
রেখে যাবে ! মূঢ় ওরা, ব্যর্থ মনস্কাম।
প্রস্তর খসিয়াছে ভূমে প্রস্তরের পরে,
চারিদিকে ভগ্নস্তূপ, তাহাদের তলে
লুপ্ত স্মৃতি ; শুষ্ক তৃণ কাল-নদী-জলে
ভেসে যায় নামগুলি, কেবা রক্ষা করে!
মানব হৃদয় ভুমি করি অধিকার,
করেছে প্রতিষ্ঠা যারা দৃঢ় সিংহাসন,
দরিদ্র আছিল তারা, ছিল না সম্বল
প্রস্তরের এত বোঝা জড় করিবার ;
তাদের রাজত্ব হের অক্ষুণ্ণ কেমন
কাল স্রোতে ধৌত নাম নিত্যসমুজ্জ্বল।
এরা যদি জানে
কামিনী রায়
এদেরও তো গড়েছেন নিজে ভগবান্ ,
নবরূপে দিয়েছেন চেতনা ও প্রাণ ;
সুখে দুঃখে হাঁসে কাঁদে স্নেহে প্রেমে গৃহ বাঁধে
বিধে শল্যসম হৃদে ঘৃণা অপমান,
জীবন্ত মানুষ এরা মায়ের সন্তান।।
এরা যদি আপনারে শেখে সম্মানিতে,
এরা দেশ-ভক্ত রূপে জন্মভূমি-হিতে
মরণে মানিবে ধর্ম বাক্য নহে — দিবে কর্ম ;
আলস্য বিলাস আজো ইহাদের চিতে
পারেনি বাঁধিতে বাসা, পথ ভুলাইতে ।।
এরা হতে পারে দ্বিজ—যদি এরা জানে,
এরা কি সভয় সরি’ রহে ব্যবধানে ?
এরা হতে পারে ,বীর, এরা দিতে পারে শির,
জননীর, ভগিনীর, পত্নীর সম্মানে,
ভবিষ্যের মঙ্গলের স্বপনে ও ধ্যানে ।
এরা যদি জানে।।
উচ্চ কূলে জন্ম ব’লে কত দিন আর
ভাই বিপ্র রবে তব এই অহংকার ?
কৃতান্ত সে কুলীনের রাখে না তো মান,
তার কাছে দ্বিজ শূদ্র পারীয়া সমান ।
তার স্পর্শে যেই দিন পঞ্চভূতে দেহ লীন
বাহ্মণে চণ্ডালে রহে কত ব্যবধান
চাহিবে না ফিরে?
কামিনী রায়
পথে দেখে ঘৃণাভরে কত কেহ গেল সরে
উপহাস করি’ কেহ যায় পায়ে ঠেলে ;
কেহ বা নিকটে আসি, বরষি সান্ত্বনারাশি
ব্যথিতেরে ব্যথা দিয়ে যায় শেষে ফেলে ।
পতিত মানব তরে নাহি কি গো এ সংসারে
একটি ব্যথিত প্রাণ, দুটি অশ্রুধার ?
পথে পড়ে, অসহায় পদতলে দলে যায়
দু’খানি স্নেহের কর নাহি বাড়াবার ?
সত্য, দোষে আপনার চরণ স্খলিত তার ;
তাই তোমাদের পদ উঠিবে ও শিরে ?
তাই তার আর্তরবে সকলে বধির হবে ।
যে যাহার চলে যাবে—চাহিবে না ফিরে ?
বর্তিকা লইয়া হাতে চলেছিল এক সাথে
পথে নিভে গেল আলো পড়িয়াছে তাই ;
তোমরা কি দয়া করে তুলিবে না হাত ধরে
অর্ধদণ্ড তার লাগি থামিবে না ভাই ?
তোমাদের বাতি দিয়া প্রদীপ জ্বালিয়া নিয়া
তোমাদের হাত ধরি হোক অগ্রসর ;
পঙ্কমাঝে অন্ধকারে ফেলে যদি দাও তারে,
আঁধার রজনী তার রবে নিরন্তর ।
পাছে লোকে কিছু বলে
কামিনী রায়
করিতে পারি না কাজ
সদা ভয় সদা লাজ
সংশয়ে সংকল্প সদা টলে,-
পাছে লোকে কিছু বলে।
আড়ালে আড়ালে থাকি
নীরবে আপনা ঢাকি,
সম্মুখে চরণ নাহি চলে
পাছে লোকে কিছু বলে।
হৃদয়ে বুদবুদ মত
উঠে চিন্তা শুভ্র কত,
মিশে যায় হৃদয়ের তলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।
কাঁদে প্রাণ যবে আঁখি
সযতনে শুকায়ে রাখি;-
নিরমল নয়নের জলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।
একটি স্নেহের কথা
প্রশমিতে পারে ব্যথা,-
চলে যাই উপেক্ষার ছলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।
মহৎ উদ্দেশ্য যবে,
এক সাথে মিলে সবে,
পারি না মিলিতে সেই দলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।
বিধাতা দেছেন প্রাণ
থাকি সদা ম্রিয়মাণ;
শক্তি মরে ভীতির কবলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।
করিতে পারি না কাজ
সদা ভয় সদা লাজ
সংশয়ে সংকল্প সদা টলে,-
পাছে লোকে কিছু বলে।
আড়ালে আড়ালে থাকি
নীরবে আপনা ঢাকি,
সম্মুখে চরণ নাহি চলে
পাছে লোকে কিছু বলে।
হৃদয়ে বুদবুদ মত
উঠে চিন্তা শুভ্র কত,
মিশে যায় হৃদয়ের তলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।
কাঁদে প্রাণ যবে আঁখি
সযতনে শুকায়ে রাখি;-
নিরমল নয়নের জলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।
একটি স্নেহের কথা
প্রশমিতে পারে ব্যথা,-
চলে যাই উপেক্ষার ছলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।
মহৎ উদ্দেশ্য যবে,
এক সাথে মিলে সবে,
পারি না মিলিতে সেই দলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।
বিধাতা দেছেন প্রাণ
থাকি সদা ম্রিয়মাণ;
শক্তি মরে ভীতির কবলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।
কত ভালবাসি
কামিনী রায়
জড়ায়ে মায়ের গলা শিশু কহে আসি,-
“মা, তোমারে কত ভালোবাসি!”
“কত ভালবাস ধন?” জননী শুধায়।
“এ-ত।” বলি দুই হাত প্রসারি’ দেখায়।
“তুমি মা আমারে ভালবাস কতখানি?”
মা বলেন “মাপ তার আমি নাহি জানি।”
“তবু কতখানি, বল।”
“যতখানি ধরে
তোমার মায়ের বুকে।”
“নহে তার পরে?”
“তার বাড়া ভালবাসা পারি না বাসিতে।”
“আমি পারি।” বলে শিশু হাসিতে হাসিতে!
জড়ায়ে মায়ের গলা শিশু কহে আসি,-
“মা, তোমারে কত ভালোবাসি!”
“কত ভালবাস ধন?” জননী শুধায়।
“এ-ত।” বলি দুই হাত প্রসারি’ দেখায়।
“তুমি মা আমারে ভালবাস কতখানি?”
মা বলেন “মাপ তার আমি নাহি জানি।”
“তবু কতখানি, বল।”
“যতখানি ধরে
তোমার মায়ের বুকে।”
“নহে তার পরে?”
“তার বাড়া ভালবাসা পারি না বাসিতে।”
“আমি পারি।” বলে শিশু হাসিতে হাসিতে!
Subscribe to:
Posts (Atom)