Showing posts with label . Show all posts
Showing posts with label . Show all posts

পরানের গহীন ভিতর

-১-
জামার ভিতর থিকা যাদুমন্ত্রে বারায় ডাহুক,
চুলের ভিতর থিকা আকবর বাদশার মোহর,
মানুষ বেকুব চুপ, হাটবারে সকলে দেখুক
কেমন মোচড় দিয়া টাকা নিয়া যায় বাজিকর।
চক্ষের ভিতর থিকা সোহাগের পাখিরে উড়াও,
বুকের ভিতর থিকা পিরিতের পূর্ণিমার চান,
নিজেই তাজ্জব তুমি একদিকে যাইবার চাও
অথচ আরেক দিকে খুব জোরে দেয় কেউ টান?
সে তোমার পাওনার এতটুকু পরোয়া করে না,
খেলা যে দেখায় তার দ্যাখানের ইচ্ছায় দেখায়,
ডাহুক উড়ায়া দিয়া তারপর আবার ধরে না,
সোনার মোহর তার পড়া থাকে পথের ধুলায় ?
এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর
যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর ।।

-২-
আন্ধার তোরঙ্গে তুমি সারাদিন কর কি তালাশ?
মেঘের ভিতর তুমি দ্যাখ কোন পাখির চক্কর?
এমন সরল পথ তবু ক্যান পাথরে টক্কর?
সোনার সংসার থুয়া পাথারের পরে কর বাস?
কি কামে তোমার মন লাগে না এ বাণিজ্যের হাটে?
তোমার সাক্ষাৎ পাই যেইখানে দারুণ বিরান,
ছায়া দিয়া ঘেরা আছে পরিস্কার তোমার উঠান
অথচ বেবাক দেখি শোয়া আছে মরনের খাটে।
নিঝুম জঙ্গলে তুমি শুনছিলা ধনেশের ডাক?
হঠাৎ আছাড় দিয়া পড়ছিল রূপার বাসন?
জলপির গাছে এক কুড়ালের কোপের মতন
তাই কি তোমার দেহে ল্যাখা তিন বাইন তালাক?
এমন বৃক্ষ কি নাই, যার ডালে নাই কোন পরী?
এমন নদী কি নাই, যার বুকে নাই কোন তরী?

-৩-
সে কোন বাটিতে দিয়াছিলা এমন চুমুক -
নীল হয়া গ্যাছে ঠোঁট, হাত পাও শরীর অবশ,
অথচ চাও না তুমি এই ব্যাধি কখনো সারুক।
আমার জানতে সাধ, ছিল কোন পাতার সে রস ?
সে পাতা পানের পাতা, মানুষের হিয়ার আকার ?
নাকি সে আমের পাতা, বড় কচি ঠোঁটের মতন ?
অথবা বটের পাতা, অবিকল মুখের গড়ন ?
তুঁতের পাতা কি তয়, বিষনিম, না কি ধুতুরার ?
কতবার গেছি আমি গেরামের শ্যাষ সীমানায়
আদাড় বাদার দিয়া অতিঘোর গহীন ভিতরে,
কতনা গাছের পাতা কতবার দিয়াছি জিহ্বায়,
এমন তো পড়ে নাই পানি এই পরানে, শিকড়ে।
তয় কি অচিন বৃক্ষ তুমি সেই ভুবনে আমার,
আমারে দিয়াছো ব্যাধি, নিরাময় অসম্ভব যার ?

-৪-
আমি কার কাছে গিয়া জিগামু সে দুঃখ দ্যায় ক্যান,
ক্যান এত তপ্ত কথা কয়, ক্যান পাশ ফিরা শোয়,
ঘরের বিছান নিয়া ক্যান অন্য ধান খ্যাত রোয়?-
অথচ বিয়ার আগে আমি তার আছিলাম ধ্যান ।
আছিলাম ঘুমের ভিতরে তার য্যান জলপিপি,
বাঁশির লহরে ডোবা পরানের ঘাসের ভিতরে,
এখন শুকনা পাতা উঠানের পরে খেলা করে,
এখন সংসার ভরা ইন্দুরের বড় বড় ঢিপি।
মানুষ এমন ভাবে বদলায়া যায়, ক্যান যায়?
পুন্নিমার চান হয় অমাবস্যা কিভাবে আবার?
সাধের পিনিস ক্যান রঙচটা রদ্দুরে শুকায়?
সিন্দুরমতির মেলা হয় ক্যান বিরান পাথার?
মানুষ এমন তয়,একবার পাইবার পর
নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর।।

-৫-
তোমার দ্যাশের দিকে ইস্টিশানে গেলেই তে গাড়ি
সকাল বিকাল আসে,এক দন্ড খাড়ায়া চম্পট,
কত লোক কত কামে দূরে যায়, ফিরা আসে বাড়ি-
আমার আসন নাই, যাওনেরও দারুন সংকট।
আসুম? আসার মতো আমি কোন ঘর দেখি নাই।
যামু যে? কোথায় যামু, বদলায়ে গেছে বেবাক।
কেমন তাজ্জব সব পাল্টায়া যায় আমি তাই
দেইখাছি চিরকাল। পরানের ভিতরে সুরাখ-
সেখানে কেবল এক ফরফর শব্দ শোনা যায়,
পাখিরা উড়াল দিয়া গ্যাছে গিয়া, এখন বিরান,
এখন যতই আমি ছড়া দেই কালিজিরা ধান,
সে কি আর আঙিনায় ফিরা আসে? আর কি সে খায়?
সকাল বিকাল গাড়ি, চক্ষু আছ তাই চক্ষে পড়ে;
পলকে পলকে গাড়ি সারাদিন মনের ভিতরে ।।

-৬-
তোমার খামাচির দাগ এখনো কি টকটাকা লাল,
এখনো জ্বলন তার চোৎরার পাতার লাহান।
শয়তান, দ্যাখো না করছ কি তুমি কি সোন্দর গাল,
না হয় দুপুর বেলা একবার দিছিলাম টান?
না হয় উঠানে ছিল লোকজন কামের মানুষ,
চুলায় আছিল ভাত, পোলাপান পিছের বাগানে,
তোমারে পরান দিছি, তাই বইলা দেই নাই হুঁশ,
আমি তো তোমারে নিতে চাই নাই ঘরের বিছানে।
হ, জানি নিজের কাছে কোনো কথা থাকে না গোপন।
দিনের দুফুর বেলা যেই তুমি আসছিলা ঘরে
আতখা এমন মনে হইছিল- আন্ধার যেমন,
আতখা এমন ছায়া সোহাগের আর্শির ভিতরে।
আবার ডাকলে পরে কিছুতেই স্বীকার হমু না।
বুকের পাষাণ নিয়া দিমু ডুব শীতল যমুনা।।

-৭-
নদীর কিনারে গিয়া দেখি নাও নিয়া গ্যাছে কেউ
অথচ এই তো বান্ধা আছিল সে বিকাল বেলায়।
আমার অস্থির করে বুঝি না কে এমন খেলায়,
আমার বেবাক নিয়া শান্তি নাই, পাচে পাছে ফেউ।
পানির ভিতরে য্যান ঘুন্নি দিয়া খিলখিল হাসে
যত চোর যুবতীরা, গ্যারামের শ্যাষ সীমানায়
বটের বৈরাগী চুল, ম্যাঘে চিল হারায় বারায়,
বুকের ভিতরে শিস দিয়া সন্ধা হাঁটে আশেপাশে।
এখন কোথায় যাই, এইখানে বড় সুনসান,
মানুষের দুঃখ আছে, জগতের আছে কিনা জানি না-
জগৎ এমনভাবে হয়া যায় হঠাৎ অচিনা।
মনে হয় আমার থিকাও একা বৃক্ষের পরান,
আমার থিকাও দুঃখী যমুনার নদীর কিনার।
আমার তো গ্যাছে এক, কত কোটি লক্ষ গ্যাছে তার।।

-৮-
আমারে তলব দিও দ্যাখো যদি দুঃখের কাফন
তোমারে পিন্ধায়া কেউ অন্যখানে যাইবার চায়
মানুষ কি জানে ক্যান মোচড়ায় মানুষের মন,
অহেতুক দুঃখ দিয়া কেউ ক্যান এত সুখ পায়?
নদীরে জীবন কই, সেই নদী জল্লাদের মতো
ক্যান শস্য বাড়িঘর জননীর শিশুরে ডুবায়?
যে তারে পরান কই, সেই ব্যাক্তি পাইকের মতো
আমার উঠানে ক্যান নিলামের ঢোলে বাড়ি দ্যায়?
যে পারে উত্তর দিতে তার খোঁজে দিছি এ জীবন,
দ্যাখা তার পাই নাই, জানা নাই কি এর উত্তর।
জানে কেউ? যে তুমি আমার সুখ, তুমিই কি পারো
আমারে না দুঃখ দিয়া? একবার দেখি না কেমন?
কেমন না যায়া তুমি পারো দেখি অপরের ঘর?-
অপর সন্ধান করে চিরকাল অন্য ঘর কারো।।

-৯-
একবার চাই এক চিক্কুর দিবার, দিমু তয়?
জিগাই কিসের সুখে দুঃখ নিয়া কর তুমি ঘর?
আঙিনার পাড়ে ফুল গাছ দিলে কি সোন্দর হয়,
দুঃখের কুসুম ঘিরা থাকে যার. জীয়ন্তে কবর
পাথারে বৃক্ষের তলে ঘন ছায়া জুড়ায় পরান,
গাঙের ভিতরে মাছ সারাদিন সাঁতরায় সুখে,
বাসরের পরে ছায়া য্যান দেহে গোক্ষুর জড়ান
উদাস সংসারে ব্যথা সারাদিন ঘাই দেয় বুকে।
তবুও সংসার নিয়া তারে নিয়া তুমি কি পাগল,
তোলো লাল শাক মাঠে, ফসফস কোটো পুঁটিমাছ,
সাধের ব্যঞ্জন করো, রান্ধো ক্ষীর পুড়ায়া আঞ্চল,
বিকাল বেলায় করো কুঙ্কুমের ফোঁটা দিয়া সাজ।
ইচ্ছা করে টান দিয়া নিয়া যাই তোমারে রান্ধুনি,
তোমার সুতায় আমি একখান নীল শাড়ি বুনি।।

-১০-
কে য্যান কানতে আছে- তার শব্দ পাওয়া যায় কানে,
নদীও শুকায়া যায়, আকালের বাতাস ফোঁপায়,
মানুষেরা বাড়িঘর বানায় না আর এই খানে,
গোক্ষুর লতায়া ওঠে যুবতীর চুলের খোঁপায়।
বুকের ভিতর থিকা লাফ দিয়া ওঠে যে চিক্কুর,
আমি তার সাথে দেই শিমুলের ফুলের তুলনা,
নিথর দুফুর বেলা, মরা পাখি, রবি কি নিষ্ঠুর,
আগুন লাগায়া দিবে, হবে খাক, তারি এ সূচনা।
অথচ আমারে কও একদিন এরও শ্যাষ আছে-
আষাঢ়ের পুন্নিমার আশা আর এ দ্যাশে করি না,
চক্ষু যে খাবলা দিয়া খায় সেই পাখি বসা গাছে,
অথচ খাড়ায়া থাকি, এক পাও কোথাও নড়ি না।
সকল কলস আমি কালঘাটে শূণ্য দেইখাছি,
তারে না দেইখাছি তাই দ্যাখনের চক্ষু দিতে রাজি।।

-১১-
কী আছে তোমার দ্যাশে? নদী আছে? আছে নাকি ঘর?
ঘরের ভিতরে আছে পরানের নিকটে যে থাকে?
উত্তর সিথানে গাছ, সেই গাছে পাখির কোটর
আছে নাকি? পাখিরা কি মানুষের গলা নিয়া ডাকে?
যখন তোমার দ্যাখা জানা নাই পাবো কি পাবো না,
যখন গাছের তলে এই দেহ দিবে কালঘুম,
যখন ফুরায়া যাবে জীবনের নীল শাড়ি বোনা,
তখন কি তারা সব কয়া দিবে আগাম-নিগুম?
আমার তো দ্যাশ নাই, নদী নাই, ঘর নাই, লোক,
আমার বিছানে নাই সোহাগের তাঁতের চাদর,
আমার বেড়ায় খালি ইন্দুরের বড় বড় ফোক,
আমার বেবাক ফুল কাফনের ইরানী আতর।
তোমার কি সাধ্য আছে নিয়া যাও এইখান থিকা,
আমার জীবন নিয়া করো তুমি সাতনরী ছিকা।

-১২-
উঠানের সেই দিকে আন্ধারের ইয়া লম্বা লাশ,
শিমের মাচার নিচে জোছনার সাপের ছলম,
পরীরা সন্ধান করে যুবতীর ফুলের কলম,
তারার ভিতরে এক ধুনকার ধুনায় কাপাশ,
আকাশে দোলায় কার বিবাহের রুপার বাসন,
গাবের বাবরি চুল আলখেল্লা পরা বয়াতির,
গাভির ওলান দিয়া ক্ষীণ ধারে পড়তাছে ক্ষীর,
দুই গাঙ্গ এক হয়া যাইতাছে- কান্দন, হাসন।
একবার আসবা না?- তোমারেও ডাক দিতে আছে
যে তুমি দুঃখের দিকে একা একা যোজন গিয়াছো?
একবার দেখবা না তোমারেও ডাক দিতে আছে
যে তুমি আঘাত নিয়া সারাদিন কি তফাত আছো?
যে নাই সে নাই সই, তাই সই, যা আছে তা আছে,
এমন পুন্নিমা আইজ, কোন দুঃখে দুয়ার দিয়াছো?

-১৩-
তোমার বিয়ার দিন মনে হইল, সত্য নিও মনে,
এত বড় এত গোল কোনোদিন দেখি নাই চান।
তুলার মতন ফুল, রাণী য্যান দরবারে বসা,
নদীর গহীন তলে জোছনায় দিয়া সে প্রাসাদ।
পাথারে নিরালা গাছ আলগোছে একখানা হাত
আমার আন্ধার পিঠে দিয়া কয়, 'তোমারে সহসা
দেখাই কিভবে সব মানুষের নিজের বানান,
পরীর সাক্ষাৎ নাই গেরস্তের বাড়ির পিছনে।'
দিঘল নায়ের মতো দুঃখ এক নদী দিয়া যায়-
মাঝি নাই, ছই নাই, নাই কোনো কেরায়া কি লোক।
না হয় অনেকে কয়- এক গেলে অন্য আর আসে,
অন্যের মধ্যে কি সেই পরানের এক পাওয়া যায়?-
তাই না সচ্ছল দ্যাশ অথচ কি বিরান সড়ক।
মানুষ বোঝে না বইলা পুন্নিমার চান এত হাসে।।

-১৪-
কি কামে মানুষ দ্যাখে মানুষের বুকের ভিতরে
নীল এক আসমান- তার তলে যমুনার ঢল,
যখন সে দেখে তার পরানের গহীন শিকড়ে
এমন কঠিন টান আচানক পড়ে সে চঞ্চল?
কিসের সন্ধান করে মানুষের ভিতরে মানুষ?
এমন কি কথা আছে কারো কাছে না কইলে নাই?
সুখের সকল দানা কি কামে যে হইয়া যায় তুষ?
জানি নাই, বুঝি নাই, যমুনারও বুঝি তল নাই।
তয় কি বৃক্ষের কাছে যামু আমি? তাই যাই তয়?
বনের পশুর কাছে জোড়া জোড়া আছে যে গহীনে?
যা পারে জবাব দিতে, গিয়া দেখি শূণ্য তার পাড়া,
একবার নিয়া আসে আকালের কঠিন সময়,
আবার ভাসায় ঢলে খ্যাতমাঠ শুকনার দিনে,
আমার আন্ধার নিয়া দেয় না সে একটাও তারা।

-১৫-
আমারে সোন্দর তুমি কও নাই কোনো একদিন,
আমার হাতের পিঠা কও নাই কি রকম মিঠা,
সেই তুমি তোমারেই দিছি আমি যুবতীর চিন-
চোখ-কানা দেখ নাই বিছানায় আছে লাল-ছিটা?
তয় কি তোমারে আমি ফাঁকি দিয়া পিছন বাড়িতে
যামু তার কাছে কও আমারে যে দিতে যায় পান?
অথবা জিগার ডালে ফাঁসি নিয়া নিজের শাড়িতে
ভূত হয়া তোমার গামছায় দিমু আন্ধারে টান?
তখন আমারে তুমি দেখি হেলা করো কি রকম,
শরীল পাথর হয়া যায় কি না পানের ছোবলে,
আমারে হারায়া দেখি জমিহারা চাষী হও কি না?
এমন দেখতে বড় সাধ হয় আল্লার কসম,
দেখার বাসনা করে কালপোকা তোমার ফসলে,
অথচ ঘরেই থাকি, পোড়া ঘরে থাকতে পারি না।।

-১৬-
যমুনার পারে আসলে তার কথা খালি মনে হয়,
এমন পরান পড়ে- সব কিছু বিকাল-বিকাল,
লোকের চেহারা দেখি, হাত নাড়ে, নাড়ে তারা পাও,
কথা কয়, তাও বোঝা যায় না যে কি কয় কি কয়।
চক্ষের ভিতরে নাচে হাটবারে বাঁওহাতি খাল,
নায়ের উপরে দাগ- একদিন রাখছিল পাও।
জলে ভেঁজা, কত বর্ষা গ্রীষ্মকাল গ্যাছে তারপর,
কতবার নাও নিয়া পাড়ি দিছি এ কুল ও কুল,
তাও সেই পাড় আমি চিনি নাই, দেখি নাই গাঙ্গে।
বুকের ভিতরে ঢেলা সারাদিন কিষানেরা ভাঙ্গে,
রাখাল নষ্টামি করে, পড়ে লাল শিমুলের ফুল,
জলের ভিতরে নড়ে মনে বান্ধা আছিল যে ঘরে।
কইছিল সে আমারে- সেই পাড়ে নিবা না আমারে?
কোন পাড়? ইচ্ছা তার আছিল সে যায় কোন পাড়ে?

-১৭-
এমন অদ্ভুতভাবে কথা কয়া ওঠে কে, আন্ধারে?-
য্যান এক উত্তরের ধলাহাঁস দক্ষিণের টানে
যাইতে যাইতে শ্যাষে শুকনা এক নদীর কিনারে
ডাক দিয়া ওঠে, ‘আগো, চেনা কেউ আছো কোনোখানে?’
আমি তো নিরালা মনে আছিলাম আমার সংসারে,
তার সেই ডাক, সেই কান্দনের আওয়াজটা কানে
যাইতেই দেখি য্যান একা আমি চৈতের পাথারে-
আমারে আমার সব নিদারুণ তীর হয়া হানে।
আমি তা্রে কি দিব উত্তর? তারে কোন কথা কই?
সে ক্যান আমারে ডাক দিয়া গেল, বুঝিনা ইয়াও।
আমি কি করবার পারি? কতটুকু ক্ষমতা আমার?
উপস্থিত মনে হয়, তারে আমি ডাক দিয়া লই,
ঝাপাইয়া ছিনতাই করি যমুনার ছিপছিপা নাও,
সকল ফালায়া দিয়া নিরুদ্দেশ সাথে যাই তার।।

-১৮-
এ কেমন শব্দ, এ কেমন কথার আদব?
কাতারে কাতার খাড়া, আমি তার ভেদ বুঝি নাই।
নিজের চিন্তার পাখি উড়ায়া যে দিমু কি তাজ্জব,
খানিক হুকুম মানে, তারপর বেবাক নাজাই।
শব্দের ভিতর থিকা মনে হয় শুনি কার স্বর,
একজন, দুইজন, দশজন, হাজার হাজার-
আমার মতন যারা ছিল এই মাটির উপর,
এখন কবরে গ্যাছে, করি আমি তাদেরই বাজার।
এরেই বন্ধন কয়? এর থিকা মুক্তি কারো নাই।
যখনি তোমার ভাষা আমি কই, তুমি ওঠো কয়া,
আমার মূর্তির মুখ আলগোছে বদলায়া দ্যাও।
যদিবা চেতনা পায়া কিছু করি হাতে লাগে ছ্যাও।
আসলে তোমার মতো এতখানি কেউ না নিদয়া,
যার দ্যাশ তার দ্যাশে চলে তার নিজের টাকাই।।

-১৯-
পথের উপরে এক বাজপড়া তালগাছ খাড়া,
পিছের জঙ্গল থিকা কুড়ালের শব্দ শোনা যায়,
যমুনার জলে দ্যাখে নাও তার নিজের চেহারা,
বাতাসের কোলে মাথা কুশালের ফসল ঘুমায়,
ধুলায় চক্কর দিয়া খেলা করে বিরান পাথার,
তুলার অনেকগুলা ফুল আটকা জিগার আঠায়,
দমের ভিতরে থামা বুকরঙ্গি মাছের কাতার,
আতখা বেবাক য্যান গিয়া পড়ছে অচিনঘাটায়।
আমিও সেবার এক সুনসানে গিয়া পড়ছিলাম-
য্যান সব টান দিয়া নিয়া গ্যাছে সে কার বারুন,
যেইদিকে চাই দেখি ভয়ানক নিঝুম নিথর,
নিয়া গ্যাছে নাম ধাম আর ইচ্ছার নায়ের বাদাম,
অঙ্গের কুসুম নিয়া খেলা করছে দুফর দারুণ,
যেদিন ফালায়া গেল আমারে সে আমার ভিতর।।

-২০-
কি কামে দুফর বেলা পাতাগুলা উড়ায় বাতাস?
আবার সে কার স্বর মাঠাপাড়ে ফোঁপায় এমন?
কি কামে আমার চক্ষে পড়ে খালি মানুষের লাশ?
যা দ্যাখার দেইখাছি, বাকি আছে আর কি দ্যাখন?
সময় দেখায়া গ্যাছে বাল্যকালে আমের সুঘ্রাণে?
যৈবন অন্যের হাতে য্যান এক কাচের বাসন,
দুঃখের পাখিরে আমি দেইখাছি বিয়ার বিহানে,
কিভাবে কালির লেখা হয়া যায় জলের লিখন।
আমারে ছাড়ান দিয়া যায় না সে যেখানেই যাই,
দ্যাশ কি বিদ্যাশ কও, চিনা কিংবা অচিনাই হও,
দুঃখের বাদাম তোলা সেই এক নাও সব গাঙ্গে।
পালায়া নিস্তার কই? সবখানে সেই না শানাই।
যেইখানেই যাই গিয়া, খাড়া দেখি সেই শও শও
পুয়ারন মিস্তিরি- তারা মনোযোগ দিয়া সব ভাঙ্গে।।

-২১-
হাজার দক্ষিণ দিকে যাও তুমি গাঙ্গের মোহানা
পাও যদি কইও আমারে। আমি না অনেক দিন
আমার যৈবন আমি মোহানার খোঁজে না দিলাম,
তাও তারে দেখি নাই, শুনি আছে ধলা গাঙচিল,
মাছের পাহারা ঘেরা খিজিরের অতল আস্তানা,
আছে তার ইশারায় আগুনের দেহ এক জ্বীন-
যদি ইচ্ছা করে তার অসম্ভব নাই কোন কাম,
যারে না পাইতে পারি তারো সাথে দিতে পারে মিল।
তুমি যে মনের মতো ঘরে আছো এই কথা কও-
সেই ভাগ্য মনে হয় খিজিরের বিশেষ অছিলা।
আমার হিসাবে কয়- মানুষের সাধ্য নাই পায়।
যতই সাধনা কর, পরানের যত কাছে রও
সে জন দুরেই থাকে, তুমি থাকো যেখানে আছিলা।
আমার জানতে সাধ, মোহানায় গ্যাছে কোন নায়।।

-২২-
এক্কেরে আওয়াজ নাই, নদী খালি চাপড় দিতাছে
গেরামের পিঠে আর ফিসফাস কইতাছে, ‘ঘুম,
ঘুমারে এখনতরি সাতভাই পূর্বদিকে আছে।‘
এক ফোঁটা ঘুম যে আসে না তার আমি কি করুম?
অখনো খেজুরগাছে টুপটুপ রস পড়তে আছে,
এত যে কান্দন আছে- তয় চক্ষু ভেজে না কেমন?
ঘাটের যুগল নাও য্যান ঠোঁটে ঠোঁট দিয়া আছে,
আমার দক্ষিণ পাশে সরে নাই চান্দের গেরন।
আধান শীতলপাটি ভরা এক আমাবস্যা নিয়া
দেখি রোজ উত্তরের একদল ধলাহাঁস নামে,
বুকের ভিতরে চুপ, তারপর আতখা উড়াল-
এ দ্যাশে মানুষ নাই, অন্যখানে তাই যায় গিয়া।
এখানে কিসের বাড়ি? এত দ্রব্য আসে কোন কামে?
কেউ না দেখুক, তারা দেইখাছে দুঃখের কুড়াল।।

-২৩-
আমারে যেদিন তুমি ডাক দিলা তোমার ভাষায়
মনে হইল এ কোন পাখির দ্যাশে গিয়া পড়লাম,
এ কোন নদীর বুকে এতগুলা নায়ের বাদাম,
এত যে অচিন বৃক্ষ এতদিন আছিল কোথায়?
আমার সর্বাঙ্গে দেখি পাখিদের রাতির পালক,
নায়ের ভিতর থিকা ডাক দ্যায় আমারে ভুবন,
আমার শরীলে য্যান শুরু হয় বৃক্ষের রোপণ,
আসলে ভাষাই হইল একমাত্র ভাবের পালক।
তাই আমি অন্যখানে বহুদিন ছিলাম যদিও,
যেদিন আমারে তুমি ডাক দিলা নিরালা দুফর,
চক্ষের পলকে গেল পালটায়া পুরানা সে ঘর,
তার সাথে এতকাল আছিল যে ভাবের সাথীও।
এখন আমার ঠোঁটে শুনি আমি অন্য এক স্বর,
ভাষাই আপন করে আর সেই ভাষা করে পর।।

-২৪-
আবার তোমার কোলে ফিরা যায় তোমার সন্তান,
আবার তোমার কোলে, খালি কোল, উথলায়া পড়ে
দুধের ঘেরানে ভরা, জননী গো, পুন্নিমার চান-
আবার সে ঘরে ফিরা আইসাছে সারাদিন পরে।
আবার সে আইসাছে করালের ঘুম চক্ষে নিয়া,
চক্ষের ভিতরে তার গেরেপ্তার বিহানের সোনা,
তবনের নীল খোপে শিমুলের লাল রঙ নিয়া,
আবার সে আইসাছে, জননী গো, তুমি কাইন্দো না।
তোমার সন্তান গ্যাছে জননী গো, সে আমার না ভাই,
আমার দেহের থিকা একখানা কাটা গ্যাছে হাত,
উঠানে খাড়ায়া আছি, খুলবা না তোমার দুয়ার?
আমার মতন যারা হারায়াছে আইজ তার ভাই,
য্যান শিলাবিষ্টি শ্যাষে পরিস্কার আকাশ হঠাৎ ,
হাজার হাজার তারা ঘিরা আছে পুন্নিমা তোমার।।

-২৫-
কত না দুধের ক্ষীর খায়া গ্যাছে কালের গোপাল,
কতবার কত রোয়া কারবালা খ্যাতের খরায়,
কন না রঙিলা নাও নিয়া গ্যাছে কাল যমুনায়,
অঘোরে হারায়া গাভি ফেরে নাই নিজস্ব রাখাল।
কত না পুকুর দিতে পারে নাই পানি গ্রীষ্মকালে,
বাসকের ছাল কত ভালো করতে পারে নাই রোগ,
দেহের কত না রক্ত খায়া গ্যাছে কত ছিনাজোঁক,
কুসুম উধাও হয়া গ্যাছে কত শিমুলের ডালে।
তাই কি ছাড়ান দিমু বিহানের ধবল দোহান?
কামারের কাছে বান্ধা দিমু এই রূপার লাঙ্গল?
আমার বৃক্ষেরে তাই দিতে কমু জহরের ফল?
বাদ দিয়া দিমু কও পরানের গহীন কথন?
আমার তিস্তারে দেখি, সেও পোষ মানে না ভাটিতে,
কি তার উথাল নাচ গেরস্তের সমান মাটিতে!

-২৬-
ক্যান তুই গিয়াছিলি?- আমি তরে জিগামু অখন
চান্দের ভিতর ফের, যেইখানে জটিলতা বাড়ে,
অশথ জড়ায়া থাকে নদী নিয়া জলের কিনারে,
আমার গেরাম ঘিরা যেইখানে খালি পলায়ন-
মানুষের, মানুষের, আর তর চক্ষের কাজল,
যেইখানে মেলা দেয় একখান সুনসান নাও,
যে নায়ে সোয়ার নাই, ‘কেডা যাও, কেডা বায়া যাও?’
বেকল আছাড় দিয়া ওঠে কালা যমুনার জল?
কেউ নাই, কেউ তর নাই, তুই নিজেই জানস,
তবু ক্যান গিয়াছিলি? ক্যান তুই দিয়াছিলি ফাল?
কিসের কি বাদ্যে তর রক্ত করে উথাল পাথাল
আমারে ক’ দেখি তুই? ক’না দেখি, কি চিল মানস?
ল’যাই জলের ধারে দ্যাখ ছায়া আমার কি তর?
মানুষে মানুষে নাই কোনো ভেদ দুঃখের ভিতর।।

-২৭-
আউসের খ্যাতে মাঠে যুবতীরা দিতাছে সাঁতার,
দ্যাখো না কেমন তারা চিতলের মতো খেলা করে,
কি তারা তালাশ করে দিনমান নাগর ভাতার-
যারা ডুব দিয়া আছে এই ধান বানের সাগরে;
বিছনের মতো পড়ে তারাবাজি চুমার চুমার,
কি ঘাই আতখা মারে খলবল এই হাসে তারা
একজন দুইজন সাতজন নাকি বেশুমার
বুকের ভিতরে ভাঙ্গে নিশীথের শরমের পাড়া।
আমি যেই সেইখানে আচানক গিয়া পড়লাম
চক্ষের নিমেষে তারা নাই আর কোনোখানে নাই,
আমি যেই সেইখানে তোমারেনি খোঁজ করলাম-
কিছু না দেইখা নিজে বেয়াকুফ বড় শরমাই।
এই ছিল এই নাই, কই গেল, কই যার তারা?
বেমালুম কই তুমি যাও গিয়া খা’বের ইশারা?

-২৮-
ঝকঝক ঝকঝক সারাদিন করে আয়নাটা-
বুকে নাই ছবি নাই পড়ে নাই একখানা ছবি,
বেবাক একাকী য্যান সুনসান ইস্কুরুপে আঁটা,
যা চাই তা নাই তয় চমৎকার আছে আর সবি।
আছে সবি আছে এক মইষের শিঙ্গের চিরুনি,
রুমাল, চুলের ফিতা জবজবা এখনোনি ত্যালে।
বিবাহের বাসরে শ্যাষ য্যান গেছে সে ফিরুনি-
ফেরার আশাও নাই, ফেরা নাই একবার গ্যালে।
গেছে তো আমারে যদি বেরহম নিয়া যায় সাথে,
আমি তো এমন ঘরে বাস করি আশা করি নাই;
য্যান হাত দিয়া আছি ইন্দুরের বিষআলা ভাতে,
তবু তো ধরে না বিষ মুখে তুলি যত লোকমাই।
নিজেরও পড়ে না ছবিকাটা সেই আয়নায়,
সে নাই চেহারা নাই, খালি বড় খালি তড়পায়।।

-২৯-
তোমারে যে ভালোবাসে এর থিকা আরো পাঁচগুণ
আল্লার কসম আমি দিমু তারে এই জামাখান,
আমার কলম আমি দিমু তারে, শরীলের খুন
দোয়াত ভরায়া দিমু, অনুরোধ খালি একখান --
সে য্যান আমার থিকা আরো ভালো পদ্য লেখে আর
যাদুমন্ত্রে রুপার শিকল হাতে দিতে পারে তার।
তোমারে যে ভালোবাসে এর থিকা আরো দশগুণ
আল্লার কসম আমি দিমু তারে এই বাড়িখান,
আমার উঠান আমি দিমু তারে. শীতের আগুন --
নিজেই সাজায়া দিমু, অনুরোধ খালি একখান --
সে য্যান আমার থিকা আরো ভালো নিদ্রা যায় আর
তারেই নিকটে পায় যার নিকটে থাকার।
নচেৎ নষ্টামি জানি, যদি পাছ না ছাড়ে আমার,
গাঙ্গেতে চুবান দিয়া তারে আমি শুকাবো আবার ।।

-৩০-
আরে ও ইসের বেটি, চুলে দিয়া শিমুলের ফুল
যাস কই, কই যাস? যুবকের মাঝখান দিয়া?
মানুষ গাঙ্গের মতো, বানে ভাসে তারো দুই কুল-
সে পানি কাতান বড়, খলবল রঙ তার সিয়া।
আরে থাম, কই যাস? তবু যায় ঘুরনান দিয়া?
শিমুল যতই লাল সেই লাল তবু কিছু কম
যত লাল যেইখানে দেহ তর লুকায় শরম।
খাড়া না করুক দেখি একবার কেউ তরে বিয়া।
বেবাক পানির টান সেইকালে নরোম সোঁতায়,
তখন পরীর রানী সেও কিনা অতি বাধ্য বশ,
তখন দেখিনা তুই আইলের বেড়া নি ভাঙ্গস,
তখন শরম দেখি থাকে তর কেমন কোথায়?
নষ্ট তর পায়ে পায়ে স্বন্নলতা আনন্তের মূল,
দিবিনে তখন তুই সিঙ্গারের আসল মাশুল।।

-৩১-
কে করে পরশ তার জীবনের এত জটিলতা?
তোমার অধিক টান দেয় বৃক্ষ দেয় বিষলতা;
একবার আমারে আছাড় দিয়া সোজা করে ফের,
আমারই মতন যারা বেশুমার সন্তান মায়ের।
কিসে যে চালনা করে এই দেহ এই ভবিষ্যৎ-
কিছুই বুঝি না, দেখি আচানক শেষ হয় পথ;
যে পথেই মেলা দেই সেই পথে ভয়ানক ভুত-
এ বড় কঠিন জাগা, বসবাস বড়ই অদ্ভুত।
তয় কি ছাড়ান দিমু হাতে ধরা শেষ রশিখান?
তয় কি পাথারে দিমু হাতে ধরা বেঘোরে পরান?
নাকি তুমি একবার হাত দিয়া ডাক দিবা কাছে
আমারেও আমার মতন যারা একা একা আছে,
সকলেরে একজোট কইরা নি তুলবা আবার?
তোমার নিকটে রাখি নিদানের এই দরবার।।

-৩২-
নিঝুম জঙ্গল দিয়া যাইতেই ধনেশের ডাক।
যেমন আতখা ভাঙ্গে কাঠুরার বুকের কাছাড়
চক্ষের পলকে তুমি দেখা দিয়া করো মেছমার;
রতির আগুনে সব দাউদাউ, পরিণামে খাক
আমার এ দেহ বটে, ভবিষ্যৎ পায় না নিস্তার;
সকল কিছুর পরে দ্যাও তুমি উড়ায়া বাদাম,
তীরের মতন তারা ধায়া যায় কও কোন ধাম?
বরং তোমার থিকা দয়াবতী জোয়ার নিস্তার।
তবুও আবার আমি ধনেশের মতো দিয়া ডাক
আবার পাথার বন পথ ঘাট বাজার সংসার
তালাশ করুম আর গাভীনের করুম সন্ধান,
আবার দেখুম আমি ছাই-পোকা মাজরার ঝাঁক
কিভাবে আমার খ্যাত করে সব শস্য ছারখার,
আবারো বুনুম আমি এই খ্যাতে কাউনের ধান।।

-৩৩-
এমন বৃক্ষ কি নাই ডালে যার নাই কোন পরী,
এমন নদী কি নাই জলে যার পড়ে না চেহারা,
এমন যাত্রা কি নাই যাতে নাই পবনের তরী,
এমন ডুলি কি নাই যাতে নাই নিষেধের ঘেরা,
এমন নারী কি নাই বুকে যার নাই ভালোবাসা,
এমন পত্র কি নাই বাক্যে যার নাই নিরাময়,
এমন শস্য কি নাই যার বীজ বোনে নাই চাষা,
এমন মৃত্যু কি নাই যাতে নাই খোয়াবের লয়?
এমন কি রূপ আছে রূপ যার গড়ে না কুমার,
এমন কি দেখা আছে দেখা যার চোখে না কুলায়,
এমন কি কথা আছে কথা যার থাকে না ধুলায়,
এমন কি নেশা আছে নেশা যার অধিক চুমার?
পরানে পরান যদি এই মতো হাজার সোয়াল
সারাদিন যমুনায় খলবল বিতল বোয়াল।।






পান করো রাত্রি

রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্

শেষ অব্দি মেঘগুলো বৃষ্টি হলো দ্যাখো-
আমি তোমাকে বলতে পারতাম,
জল, বাষ্প আর আর্দ্র বাতাসের কথা।
সূর্যাস্তের আগে
মেঘেরা পেখম মেলে
ছুঁয়ে দ্যায় প্রজাপতির ডানার তন্ময়তা
তোমাকে বলতে পারাতাম দ্রাক্ষরস আর
অফুরন্ত উল্লাসের কথা।
আমি স্পর্শের শিশির হয়ে ঝ’ড়ে
আঙুলে,চুলে ও চিবুকের
সরল নিসঙ্গতায়
হতে পারতাম অন্তরঙ্গ উদাসিনতার ঘ্রান।
একটি ওষ্ঠের ফুল
ছুঁয়ে থেকে দীর্ঘদিন কাটিয়ে দিয়েছি-
আমি তোমাকে বলতে পারতাম
বৃক্ষ-স্বভাবের কথা।
পুষ্প,রেনু ও প্রজাপতির কথা।
কিছুই বলিনি।
আমার হাতের পেয়ালায়
না, দ্রাক্ষার রস নয়
ভরা ছেলো মানুষের রক্ত
এতো মৃত্যু দিয়ে বোনা হচ্ছে সভ্যতার রঙিন শিখর!
এতো ঘাম দিয়ে
সভ্যতা সাজাচ্ছে
তার মখমল চুড়া!
পেয়ালা উপচে পড়ে কষ্ট।
তুমি পান করছো না কেন?
কেন সব অনর্থক বেলুন উড়িয়ে হয়ে আছো
নিমগ্ন পাথর?
তুমি পান করছো না সখি?
উপচে পড়ছে
নুয়ে পড়ছে সাহস
শেষ সীমানায় এস পেছনে দেয়াল।
গ্লাস উপচে পড়ছে-
তুমি পান করছো না কেন রাত্রি?

পাখী সব করে রব

মদনমোহন তর্কালঙ্কার

পাখী-সব করে রব, রাতি পোহাইল।
কাননে কুসুমকলি, সকলি ফুটিল।।
রাখাল গরুর পাল, ল'য়ে যায় মাঠে।
শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে।।
ফুটিল মালতী ফুল, সৌরভ ছুটিল।
পরিমল লোভে অলি, আসিয়া জুটিল।।
গগনে উঠিল রবি, লোহিত বরণ।
আলোক পাইয়া লোক, পুলকিত মন।।
শীতল বাতাস বয়, জুড়ায় শরীর।
পাতায় পাতায় পড়ে, নিশির শিশির।।
উঠ শিশু মুখ ধোও, পর নিজ বেশ।
আপন পাঠেতে মন, করহ নিবেশ।।

প্রার্থনা

অক্ষয় কুমার বড়াল

দুঃখী বলে,      'বিধি নাই, নাইকো বিধাতা ;
চক্রসম অন্ধ ধরা চলে ।'
সুখী বলে,       'কোথা দুঃখ, অদৃষ্ট কোথায় ।
ধরণী নরের পদতলে ।'
জ্ঞানী বলে,      'কার্য আছে , কারণ দুর্জ্ঞেয়;
এ জীবন প্রতীক্ষা-কাতর ।'
ভক্ত বলে,       'ধরণীর মহারাসে সদা
ক্রীড়ামত্ত রসিক-শেখর ।'
ঋষি বলে       'ধ্রুব তুমি, বরেন্য ভূমায় ।'
কবি বলে      'তুমি শোভাময় ।'
গৃহি আমি, জীব যুদ্ধে ডাকি হে কাতরে,      
'দয়াময়, হও হে সদয় ।'

প্রিয়-বিরহ

কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার

বিনা প্রয়োজন                 রম্য উপবন,
কন্টক-কানন প্রায়;
পুষ্প বিরচণ                 কোমল শয়ন,
তৃণশয্যা তুলনায়।
সুভক্ষ্য নিচয়                 বিষময় হয়,
লুকায় সুতার তার;
নিরখি নয়নে                 দিবস তখনে
তমঃপূর্ণ ত্রিসংসার।
কিন্তু যে সময়,                 প্রিয় সঙ্গে রয়,
বন উপবন হয়।
দুর্বাদলচয়                 সুখ-শয্যা হয়,
পুষ্পশয্যা তুল্য নয়;
পর্ণ-বিরচিত                 উটজ নিশ্চিত
সৌধসম শোভা ধরে;
তিক্ত ফলচয়                 হয় সুধাময়
অহো কি তৃপ্তি বিতরে!
ঘোর তমস্বিনী                 সে অমা-যামিনী
সেই পৌর্ণমাসী হয়;
দুঃখ ঘটো যায়                 সুখবোধ তায়,
অসুখ লেশ না রয়।

প্রণয়-কানন

কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার

অতিশয় ভয়ঙ্কর প্রণয়-কানন,
অশেষ আতঙ্ক-তরু পরশে গগন।
শাখা-প্রশাখায় তারা গহন এমন,
প্রবেশে না মাঝে জ্ঞান-তড়ন-কিরণ।
হতাশা-কন্টকীলতা বেষ্টিত তথায়,
পায় পায় বিদ্ধ হয় প্রেমিকের পায়।
বিষম বিরহ-ব্যাঘ্র বিকট-বদন,
নিয়ত এ বনে করে ভীষণ গর্জন।
নিনাদে তাহার হায়! নিনাদে তাহার,
কত প্রেমিকের প্রাণত্যজে দেহাগার।
প্রিয়-প্রেম-সুখ-মৃগ, এ প্রেম গহনে,
হরে প্রেমাকাঙ্ক্ষি-মন, মোহন নর্তনে।
করিতে গহন তারে অনেকেই ধায়;
বিরহ-শার্দুল-গ্রাসে শেষে মারা যায়।
যে প্রেমিক সাহস-মাতঙ্গপরি চড়ি
সহিষ্ণুতা দৃঢ়বর্মে সর্বাঙ্গ আবরি,
নির্ভয়ে প্রবেশে প্রেম-বিপিন মাঝার,
নিরাশা-কন্টক নাহি ফুটে দেহে তার;
বিরহ-শার্দুল নারে গ্রাসিবারে তায়,
প্রিয়-প্রেম-সুখ-মৃগ দরিতে সে পায়।
হাফেজ! যদ্যপি পার এরূপ করিতে,
প্রিয়-প্রেম-সুখ-মৃগ পারিবে ধরিতে।

পাপ-কেতকী

কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার

একদিন ধীরে ধীরে মনের উল্লাসে
উপনিত কেতকী-কুশুমশ্রেণী পাশে।
হেরিলাম কত শত শত মধুকর,
সুসোরেভ হয়ে তারা বিমুগ্ধ-অন্তর,
মধুপূর্ণ কমল করিয়া পরিহার,
মধু-আশে কেতকীতে করিছে বিহার;
কিন্তু মধু কোথা পাবে সে কেতকীফুলে!
শুধু হয় ছিন্নপক্ষ কন্টকের হুলে।
তথাপি সে বিমূর অবোধ অলিগণ,
উড়িয়া কমসদলে না করে গমন।
ভাবিলাম এইরূপ মানব সকল,
ত্যজি পরিমলপূর্ণ তত্ব-শতদল;
সুখ-সুধা আশে সদা প্রফুল্ল অন্তরে,
বিষয় কেতকীবনে অনিক্ষণ চরে।
কোথা পাবে সে অমিয়, ব্যর্থ আকিঞ্চন,
সার দুঃখ কন্টকের ডাতনা ভীষণ।
তবু তত্ব-সরজিতে না করে বিহার;
ধিক রে মানব তোরে ধিক শতবার।

পুব-পশ্চিম

অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

তোমার শীতললক্ষ্যা আর আমার ময়ূরাক্ষী
তোমার ভৈরব আর আমার রূপনারায়ণ
তোমার কর্ণফুলি আর আমার শিলাবতী
তোমার পায়রা আর আমার পিয়ালী
এক জল এক ঢেউ এক ধারা
একই শীতল অতল অবগাহন, শুভদায়িনী শান্তি |
তোমার চোখের আকাশের রোদ আমার চোখের উঠোনে এসে পড়ে
তোমার ভাবনার বাতাস আমার ভাবনার বাগানে ফুল ফোটায় |

তোমার নারকেল সুপুরি অশোক শিমুল
আমার তাল খেজুর শাল মহুয়া
এক ছায়া এক মায়া একই মুকুল মঞ্জরী |
তোমার ভাটিয়াল আমার গম্ভীরা
তোমার সারি-জারি আমার বাউল
এক সুর এক টান একই অকূলের আকূতি
তোমার টাঙ্গাইল আমার ধনেখালি
তোমার জামদানি আমার বালুচর
এক সুতো এক ছন্দ একই লাণ্যের টানা-পোড়েন
চলেছে একই রূপনগরের হাতছানিতে |

আমরা এক বৃন্তে দুই ফুল, এক মাঠে দুই ফসল
আমাদের খাঁচার ভিতরে একই অচিন পাখির আনাগোনা |
আমার দেবতার থানে তুমি বটের ঝুরিতে সুতো বাঁধো
আমি তোমার পীরের দরগায় চেরাগ জ্বালি |
আমার স্তোত্রপাঠ তোমাকে ডাকে
তোমার আজান আমাকে খুঁজে বেড়ায় |

আমাদের এক সুখ এক কান্না এত পিপাসা
ভূগোল ইতিহাসে আমরা এক
এক মন এক মানুষ এক মাটি এক মমতা
পরস্পর আমরা পর নই
আমরা পড়শী ---আর পড়শীই তো আরশি
তুমি সুলতানা আমি অপূর্ব
আমি মহবুব তুমি শ্যামলী |

আমাদের শত্রুও সেই এক
যারা আমাদের আস্ত মস্ত সোনার দেশকে খন্ড-খন্ড করেছে
যারা আমাদের রাখতে চায় বিচ্ছিন্ন করে বিরূপ করে বিমুখ করে |
কিন্তু নদীর দুর্বার জলকে কে বাঁধবে
কে রুখবে বাতাসের অবাধ স্রোত
কে মুছে দেবে আমাদের মুখের ভাষা আমাদের রক্তের কবিতা
আমাদের হৃদয়ের গভীর গুঞ্জন ?
তুমি আমার ভাষা বলো আমি আনন্দকে দেখি
আমি তোমাদের ভাষা বলি তুমি আশ্চর্যে দেখ
এই ভাষায় আমাদের আনন্দে -আশ্চর্যে সাক্ষাত্কার |
কার সাধ্য অমৃতদীপিত সূর্য-চন্দ্রকে কেড়ে নেবে আকাশ থেকে ?

আমাদের এক রবীন্দ্রনাথ এক নজরুল |
আমরা ভাষায় এক ভালোবাসায় এক মানবতায় এক
বিনা সুতোয় রাখীবন্ধনের কারিগর
আমরাই একে অন্যের হৃদয়ের অনুবাদ
মর্মের মধুকর, মঙ্গলের দূত
আমরাই চিরন্তন কুশলসাধক ||

প্রিয়া ও পৃথিবী

অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

নিঃশঙ্ক, নিঃশব্দপদে একদিন এসেছিলে কাছে
ঈপ্সিত মৃত্যুর মতো, নয়নে যেটুকু বহ্নি আছে,
অধরে যেটুকু ক্ষুধা --- সব দিয়ে লইলাম মুছে
লোলুপ লাবণ্য তব; দিনান্তের দুঃখ গেলো ঘুচে,
উদিলো সন্ধ্যার তারা দিগ্বধূর ললাটের টিপ |
কদম্বপ্রসব-সম জ্ব’লে ওঠে কামনাপ্রদীপ,
যুগ্ম দেহে ; শ্মশানে অতসী হাসে, নিকষে কনক ;
মেঘলগ্ন ঘনবল্লী আকূল পলকে নিষ্পলক |
কঙ্করে অঙ্কুর জাগে, মরুভূতে ফুটিলা মালতী----
তুমি রতি মূর্তিমতী, আর আমি আনন্দ-আরতি |
দেহের ধূপতি হ’তে জ্ব’লে ওঠে বাসনার ধুনা
লেলিহরসনা, তবু কালো চোখে কোমল করুণা |
শুভ্র ভালে খেলা করে তৃতীয়ার ম্লান শিশু শশী,
তোমার বরাঙ্গ যেন সন্ধ্যাস্নিগ্ধ, শ্যামল তুলসী |
ভুজের ভুজঙ্গতলে হে নতাঙ্গী, নির্ভয় নির্ভরে
তোমার স্তনাগ্রচূড়া কাঁপিলো নিবিড় থরথরে |
স্ফুরত্প্রবাল ওষ্টে গূঢ়ফণা চুম্বন-উত্সুক,
এপারে রক্তাশোক, অন্য তটে হিংসুক কিংশুক |
শ্লথ হ’লো নীবিবন্ধ, চূর্ণালক, শিথিল কিঙ্কিণী,
কজ্জলে মলিন হ’লো পান্ডু গন্ড, কাটিলো যামিনী |
দূরে বুঝি দেখা দিলো দিগ্বালার রজত-বলয়,
বলিলাম কানে-কানে : ‘মরণের মধুর সময় |’
আজি তুমি পলাতকা, মুক্তপক্ষ পাখি উদাসীন,
ক্লান্ত, দূর নভোচারী দিগন্তের সীমান্তে বিলীন |
বিদ্যুৎ ফুরায়ে গেছে, কখন বিদায় নিলো মেঘ,
অবিচল শূন্যতার নভোব্যাপী নিস্তব্ধ উদ্বেগ
আবরিয়া রহিয়াছে হৃদয়ের অনন্ত পরিধি
চাহি না ঘৃণিত মৃত্য, তব গুপ্ত হীন প্রতিনিধি |
নীবিবন্ধ শিথিলিতে কটিতটে যদিও কিঙ্কিনী,
বাজে আজো, কজ্জলে মলিন গন্ড, তবু, কলঙ্কিনী,
চাহি না অতীত মৃত্যু | নভস্তলে অনিবন্ধনীবি
ঘুম পায় পার্শ্বে মোর বীরভোগ্যা প্রেয়সী পৃথিবী |
তারে চাই ; তাহারি সুধার তরে অসাধ্য সাধনাস,
বিস্মিত আকাস ঘিরি’ সুস্মিত, সনীল অভ্যর্থনা,
অজস্র প্রশ্রয় | মৃত্তিকার উদ্বেলিত পয়োধরে
সম্ভোগের সুরাস্রোত ওষ্ঠাধরে উচ্ছসিয়া পড়ে,
শস্য ফলে, নদী বহে, ঊর্ধ্বে জাগে উত্তুঙ্গ পর্বত,
হাস্য করে মৌনমুখে উলঙ্গ, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ |
আয়ুর সমুদ্র মোর দুই চক্ষে, মৃত্যু পদলীন,
তোমার বিস্মৃতি দিয়া পৃথিবীরে করেছি রঙিন |
নক্ষত্র-আলোক হ’তে সমুদ্রের তরঙ্গ অবধি
ব’হে চলে একখানি পরিপূর্ণ যৌবনের নদী |
তারি তলে করি স্নান, নাহি কূল, নাহি পরিমিতি,
তুমি নাই, আছে মুক্তি, পৃথ্বীব্যাপী প্রচুর বিস্মৃতি |

প্রথম যখন

অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

প্রথম যখন দেখা হয়েছিল, কয়েছিলে মৃদুভাষে
‘কোথায় তোমারে দেখেছি বলো তো,---- কিছুতে মনে না আসে |
কালি পূর্ণিমা রাতে
ঘুমায়ে ছিলে কি আমার আতুর নয়নের বিছানাতে ?
মোর জীবনের হে রাজপুত্র, বুকের মধ্য়মণি,
প্রতি নিশ্বাসে শুনেছি তোমার স্তব্ধ পদধ্বনি !
তখনো হয়তো আঁধার কাটেনি,---সৃষ্টির শৈশব,-----
এলে তরুণীর বুকে হে প্রথম অরুনের অনুভব !’
আমি বলেছিনু, ‘জানি,
স্তবগুঞ্জন তুলি তোরে ঘিরে হে মোর মক্ষিরানী !’
যাপিলাম কত পরশ তপ্ত রজনী নিদ্রাহীন,
দু’চোখে দু’চোখ পাতিয়া শুধালে, ‘কোথা ছিলে এতদিন ?’
লঘু দুটি বাহু মেলে’
মোর বলিবার আগেই বলিলে ; ‘যেয়ো না আমাকে ফেলে |’

আজি ভাবি ব’সে বহুদিন পরে ফের যদি দেখা হয়,
তেমনি দু’চোখে বিশ্বাসাতীত জাগিবে কি বিস্ময় ?
কহিবে কি মৃদুহাসে,
‘কোথায় তোমারে দেখেছি বলো তো, কিছুতে মনে না আসে ||’

প্রস্তুত

সুকান্ত ভট্টাচার্য

কালো মৃত্যুরা ডেকেছে আজকে স্বয়ম্বরায়,
নানাদিকে নানা হাতছানি দেখি বিপুল ধরায় |
ভীত মন খোঁজে সহজ পন্থা, নিষ্ঠুর চোখ ;
তাই বিষাক্ত আস্বাদময় এ মর্তলোক,
কেবলি এখানে মনের দ্বন্দ্ব আগুন ছড়ায় |

অবশেষে ভুল ভেঙেছে, জোয়ার মনের কোণে,
তীব্র ভ্রূকুটি হেনেছি কুটিল ফুলের বনে ;
অভিশাপময় যে স আত্মা আজো অধীর,
তাদের সকাশে রেখেছি প্রাণের দৃঢ় শিবির;
নিজেকে মুক্ত করেছি আত্মসমর্পণে |

চাঁদের স্বপ্নে ধুয়ে গেছে মন যে-সব দিনে,
তাদের আজকে শত্রু বলেই নিয়েছি চিনে,
হীন স্পর্ধারা ধূর্তের মতো শক্তিশেলে-----
ছিনিয়ে আমায় নিতে পারে আজো সুযোগ পেলে
তাই সতর্ক হয়েছি মনকে রাখি নি ঋণে |

অসংখ্য দিন কেটেছে প্রাণের বৃথা রোদনে
নরম সোফায় বিপ্লবী মন উদ্বোধনে ;
আজকে কিন্তু জনতা-জোয়ারে দোলে প্লাবন,
নিরন্ন মনে রক্তিম পথ অনধাবন,
করছে পৃথিবী পূর্ব-পন্থা সংশোধনে |
অস্ত্র ধরেছি এখন সমুখে শত্রু চাই,
মহামারণের নিষ্ঠুর ব্রত নিয়েছি তাই ;
পৃথিবী জটিল, জটিল মনের সম্ভাষণ
তাদের প্রাভাবে রাখি নি মনেতে কোনো আসন,
ভুল হবে জানি তাদের আজকে মনে করাই ||

পিঁপড়ে

অমিয় চক্রবর্তী

আহা পিঁপড়ে ছোটো পিঁপড়ে ঘুরুক দেখুক থাকুক
কেমন যেন চেনা লাগে ব্যস্ত মধুর চলা —
স্তব্ ধ শুধু চলায় কথা বলা —
আলোয় গন্ধে ছুঁয়ে তার ঐ ভুবন ভ’রে রাখুক,
আহা পিঁপড়ে ছোটো পিঁপড়ে ধুলোর রেণু মাখুক ||

ভয় করে তাই আজ সরিয়ে দিতে
কাউকে, ওকে চাইনে দুঃখ দিতে |
কে জানে প্রাণ আনলো কেন ওর পরিচয় কিছু,
গাছের তলায় হাওয়ার ভোরে কোথায় চলে নিচু —
আহা পিঁপড়ে ছোটো পিঁপড়ে সেই অতলে ডাকুক |
মাটির বুকে যারাই আছি এই দুদিনের ঘরে
তার স্মরণে সবাইকে আজ ঘিরেছে আদরে ||

প্রিয় স্বাধীনতা

শামসুর রাহমান

মেঘনা নদী দেব পাড়ি
কল-অলা এক নায়ে।
আবার আমি যাব আমার
পাড়াতলী গাঁয়ে।

গাছ-ঘেরা ঐ পুকুরপাড়ে
বসব বিকাল বেলা।
দু-চোখ ভরে দেখব কত
আলো-ছায়ার খেলা।

বাঁশবাগানে আধখানা চাঁদ
থাকবে ঝুলে একা।
ঝোপে ঝাড়ে বাতির মতো
জোনাক যাবে দেখা।

ধানের গন্ধ আনবে ডেকে
আমার ছেলেবেলা।
বসবে আবার দুচোখে জুড়ে
প্রজাপতির মেলা।

হঠাৎ আমি চমকে উঠি
হলদে পাখির ডাকে।
ইচ্ছে করে ছুটে বেড়াই
মেঘনা নদীর বাঁকে।

শত যুগের ঘন আঁধার
গাঁয়ে আজো আছে।
সেই আঁধারে মানুষগুলো
লড়াই করে বাঁচে।

মনে আমার ঝলসে ওঠে
একাত্তরের কথা,
পাখির ডানায় লিখেছিলাম-
প্রিয় স্বাধীনতা।

প্রতিনায়কের স্বগতোক্তি


বেলাল চৌধুরী

আমার গোপন পাপগুলি এতদিন পর
বিরূপ-বৈরিতায় শস্ত্রপাণি হয়ে উঠেছে
এবার তাদের বজ্রনির্ঘোষ কন্ঠে
উচ্চারিত হলো- আমার কঠোর দন্ডাজ্ঞা
আমার মাথার ওপর উত্তোলিত তীক্ষ্ন কৃপাণ
চোখের সামনে জ্বলন্ত লাল লৌহশলাকা
ওদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে এবার ওরা অটল
আমার সর্বাঙ্গ ছেঁকে ধরেছে মাছির মতো
বিস্ফোটক দগদগে ঘা পুঁজ আর শটিত গরল
গোপন পাপের শরশয্যায় শুয়ে আমি
নিদারুণ তৃষ্ণায় ছটফট করছি- হায় রে জলধারা
কিন্তু এবার ওরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ- নিষ্কৃতি নেই আমার
নির্বাসনে মৃত্যুদন্ড- ঠান্ডা চোখে দেখছি আমি
নীল কুয়াশায় ঢাকা পড়ছে আমার দেহ ।

পুনর্বাসন


শঙ্খ ঘোষ

যা কিছু আমার চার পাশে ছিল
ঘাসপাথর
সরীসৃপ
ভাঙা মন্দির
যা কিছু আমার চার পাশে ছিল
নির্বাসন
কথামালা
একলা সূর্যাস্ত
যা কিছু আমার চার পাশে ছিল
ধ্বংস
তীরবল্লম
ভিটেমাটি
সমস্ত একসঙ্গে কেঁপে ওঠে পশ্চিম মুখে
স্মৃতি যেন দীর্ঘযাত্রী দলদঙ্গল
ভাঙা বাক্স প’ড়ে থাকে আমগাছের ছায়ায়
এক পা ছেড়ে অন্য পায়ে হঠাত সব বাস্তুহীন |

যা কিছু আমার চার পাশে আছে—
শেয়ালদা
ভরদুপুর
উলকি-দেয়াল
যা কিছু আমার চার পাশে আছে—
কানাগলি
স্লোগান
মনুমেন্ট
যা কিছু আমার চার পাশে আছে—
শরশয্যা
ল্যাম্প পোস্ট
লাল গঙ্গা
সমস্ত এক সঙ্গে ঘিরে ধরে মজ্জার অন্ধকার
তার মধ্যে দাঁড়িয়ে বাজে জলতরঙ্গ
চূড়োয় শূণ্য তুলে ধরে হাওড়া ব্রিজ
পায়ের নিচে গড়িয়ে যায় আবহমান |

যা কিছু আমার চার পাশে ঝর্না
উড়ন্ত চুল
উদোম পথ
ঝোড়ো মশাল
যা কিছু আমার চার পাশে স্বচ্ছ
ভোরের শব্ দ
স্নাত শরীর
শ্মশান শিব
যা কিছু আমার চার পাশে মৃত্যু
একেক দিন
হাজার দিন
জন্ম দিন
সমস্ত একসঙ্গে ঘুরে আসে স্মৃতির হাতে
অল্প আলোয় বসে থাকা পথ ভিখারি
যা ছিল আর যা আছে দুই পাথর ঠুকে
জ্বালিয়ে নেয় এতদিনের পুনর্বাসন |

প্রেম-প্রতিমা

কায়কোবাদ

( ১ )
আমি দেখিতাম শুধু তারে!
মধুর চাঁদনীময়ী                মধুরা যামিনী,
শশধর হাসিত অম্বরে!
সে থখন ধীরে ধীরে,                 এসে এই নদীতীরে,
গাইত প্রেমের গীত মাতায়ে ধরণী ;
তাহার মধুর স্বরে                 মুকুতা পড়িত ঝ'রে
নীরবে বহিয়া যেত আকুলা তটিনী!
আমি দেখিতাম শুধু তারে!

( ২ )
সে আমার সুখে দুঃখে প্রাণের সঙ্গিনী!
তারি তরে বেঁচে আছি ভবে!
জীবন-জলধি-পাড়ে,                 আর কি পাইব তারে
এক দুই করে আমি মাসদিন গণি!
সে চাঁদ ওঠে না আর,                 ঢালে না সে সুধা ধার,
আমি তার সে আমার --- শুধু এই জানি!
সে আসিবে কবে!

( ৩ )
তাহারি চরণ চুমি বনকমলিনী
ফুটিয়া উঠিত থরে থরে!
সে নিতি উন্মুক্ত কেশে,                 ফুলরাণী-বেশে এসে
দাঁড়াইয়া এই সরঃতীরে
গাইত প্রেমের গান,                 আকুল করিয়া প্রাণ
বিহগ শিখিত সেই প্রেমের রাগিনী!
আমি দেখিতাম শুধু তারে!

( ৪ )
সে সদা কুসুম-সাজে এলাইয়া বেণী
আমার এ প্রাণ নিত কেড়ে!
চারিধারে পুষ্প-তরু,                 বায়ু ব'ত ঝুরু ঝুরু
কোকিল তুলিত কত কুহু কুহু ধ্বনি!
হেরি তার রূপরাশি,                 হেরি তার প্রেমহাসি,
পাপিয়া আকুল প্রাণে হ'ত পাগলিনী!
আমি দেখিতাম শুধু তারে!

( ৫ )
তাহারি রূপের ছটা উজলি ধরণী
ঝরিয়া পড়িত চারি ধারে!
আকাশে চন্দ্রমা-তারা,                 তারি প্রেমে মাতোয়ারা
নয়নে খেলিত তার চঞ্চলা দামিনী!
বুকেতে অমৃত-খনি                 কণ্ঠে সুধা-নির্ঝরণী
সৌন্দর্য-সরসে সে যে ফুটন্ত নলিনী!
আমি দেখিতাম শুধু তারে!


প্রণয়ের প্রথম চুম্বন

কায়কোবাদ

( ১ )
মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন!
যবে তুমি মুক্ত কেশে,
ফুলরাণী বেশে এসে,
করেছিলে মোরে প্রিয় স্নেহ-আলিঙ্গন!
মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন?

( ২ )
প্রথম চুম্বন!
মানব জীবনে আহা শান্তি-প্রস্রবণ!
কত প্রেম কত আশা,
কত স্নেহ ভালবাসা,
বিরাজে তাহায়, সে যে অপার্থিব ধন!
মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন!

( ৩ )
হায় সে চুম্বনে
কত সুখ দুঃখে কত অশ্রু বরিষণ!
কত হাসি, কত ব্যথা,
আকুলতা, ব্যাকুলতা,
প্রাণে প্রাণে কত কথা, কত সম্ভাষণ!
মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন!

( ৪ )
সে চুম্বন, আলিঙ্গন, প্রেম-সম্ভাষণ,
অতৃপ্ত হৃদয় মূলে
ভীষণ ঝটিকা তুলে,
উন্মত্ততা, মাদকতা ভরা অনুক্ষণ,
মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন!

পলাতকা

কাজী নজরুল ইসলাম

কোন্‌ সুদূরের চেনা বাঁশীর ডাক শুনেছিস্‌ ওরে চখা?
ওরে আমার পলাতকা!
তোর প'ড়লো মনে কোন্‌ হারা-ঘর,
স্বপন-পারের কোন্‌ অলকা?
ওরে আমার পলাতকা!
তোর জল ভ'রেছে চপল চোখে,
বল্‌ কোন্‌ হারা-মা ডাকলো তোকে রে?
ঐ গগন-সীমায় সাঁঝের ছায়ায়
হাতছানি দেয় নিবিড় মায়ায়-
উতল পাগল! চিনিস্‌ কি তুই চিনিস্‌ ওকে রে?
যেন বুক-ভরা ও গভীর স্নেহে ডাক দিয়ে যায়, "আয়,
ওরে আয় আয় আয়,
কেবল আয় যে আমার দুষ্টু খোকা!
ওরে আমার পলাতকা!"
দখিন্‌ হাওয়ায় বনের কাঁপনে-
দুলাল আমার! হাত-ইশারায় মা কি রে তোর
ডাক দিয়েছে আজ?
এতকদিনে চিন্‌লি কি রে পর ও আপনে!
নিশিভোরেই তাই কি আমার নামলো ঘরে সাঁঝ!
ধানের শীষে, শ্যামার শিসে-
যাদুমণি! বল্‌ সে কিসে রে,
তুই শিউরে চেয়ে ছিঁড়লি বাঁধন!
চোখ-ভরা তোর উছলে কাঁদন রে!
তোরে কে পিয়ালো সবুজ স্নেহের কাঁচা বিষে রে!
যেন আচম্‌কা কোন্‌ শশক-শিশু চ'ম্‌কে ডাকে হায়,
"ওরে আয় আয় আয়
আয় রে খোকন আয়,
বনে আয় ফিরে আয় বনের চখা!
ওরে চপল পলাতকা"||

পল রবসন

নাজিম হিকমত

ওরা ভয় পেয়েছে রবসন
ভয় রাত্রি প্রভাত হবার
ভয় রূপের, ভয় শব্দের, ভয় স্পর্শের।

ওরা আমাদের গান গাইতে দেয়না পল রবসন
তীব্র নিখাদে গাওয়া নিগ্রো ভাই আমার
আমরা আমাদের গান গাই ওরা চায়না
ভালবাসায় ওদের আতঙ্ক
বীজ আর মাটিতে আতঙ্ক
আতঙ্ক স্রোতের জলে।

আর কোন বন্ধুর হাতের স্মৃতি
যা চায়না কোন সুদ, কোন দস্তুরে।
যে হাত তাদের মনিবন্ধে দু’দন্ড
পাখির মত কোনদিন বসেনি।
আমাদের গান ওদের আতঙ্ক।।

পেয়েছি

অনঙ্গমোহিনী দেবী

তোমারে আমি রেখেছি বুকে
               সুখের তরে নয়,
তোমারে আমি পেয়েছি দুখে
               দুখেরে করি জয়!

                               আকাশ ছেপে তোমার প্রীতি
                                               বাতাস সম আসে
                               শীতলি’ মম চিত্ত নিতি
                                               বিচরে প্রাণ-বাসে!

আসে গো সুখ, দুঃখ দলি
               চাহিনে আমি তারে ;
বিকাশে নব প্রীতির কলি
               সুরভি মধ্য-ভারে।

                               এ দেহ প্রাণ, তোমার কাছে
                                               দিয়াছি সঁপে আমি,
                               আমার গানে জড়ায়ে আছে
                                               তোমার সুর স্বামী!

এপারে কভু পাবনা আমি!
               যেদিন মম সাঁঝে---
ওপারে যাব, জীবন স্বামী!
               উদিবে হৃদিমাঝে।

                               দোঁহের প্রীতি-অভিজ্ঞানে
                                               চিনিব দোঁহে ত্বরা,
                               তৃপ্ত মোরা হইব, পানে
                                               অমৃত চিত-ভরা!