কবি-পরিচিতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই মে (২৫ শে বৈশাখ, ১২৬৮ বঙ্গাব্দ) কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকালে রবীন্দ্রনাথকে ওরিয়েন্টাল সেমিনারি, নর্মাল স্কুল, বেঙ্গল একাডেমী প্রভৃতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার জন্য পাঠানো হলেও তিনি বেশিদিন স্কুলের শাসনে থাকতে পারেননি । সতেরো বছর বয়সে তাঁকে পাঠানো হয় ব্যারিস্টার পড়ার জন্য । কিন্তু দেড় বছর পর তিনি ব্যারিস্টারি পড়া অসম্পূর্ণ রেখে দেশে ফিরে আসেন । ১৯১৩ খিষ্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলি কাব্যের জন্য এশিয়দের মধ্যেপ্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন । রবীন্দ্রনাথের একক সাধনায় বাংলা ভাষা সকল সকল শাখায় সমৃদ্ধ হয়ে বিশ্ব-দরবারে সগৌরবে প্রতি প্রতিষ্ঠিত হয় । কাব্য, ছোটগল্প, উপন্যাস, ভ্রমনকাহিনী, নাটক, প্রবন্ধ, গান-সাহিত্যের প্রত্যেক বিভাগেই তাঁর অবদান রয়েছে । তিনি একাধারে সাহিত্যক, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, সুরকার,চিত্রকার,নাট্যকার, নাট্যপ্রযোজক এবং অভিনেতা ছিলেন ।তাঁর অজস্র রচনার মধ্যে সোনার তরী, চিত্রা, বলাকা, ক্ষণিকা, ঘরে বাইরে, গোরা, শেষের কবিতা, বিসর্জন, রক্তকরবী ও গল্পগুচ্ছ বিশেষ উল্লেখযোগ্য ।কলকাতা, ঢাকা, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি সম্মানসূচক ডি.লিট. ডিগ্রী লাভ করেন ।
রবীন্দ্রনাথ ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই আগষ্ট (২২শে শ্রাবণ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) কলকাতায় পরলোকগমন করেন । রবী বৃত্তান্ত...
Showing posts with label alk088. Show all posts
Showing posts with label alk088. Show all posts
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কাগজের নৌকা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছুটি হলে রোজ ভাসাই জলে
কাগজ-নৌকাখানি।
লিখে রাখি তাতে আপনার নাম,
লিখি আমাদের বাড়ি কোন গ্রাম
বড়ো বড়ো ক'রে মোটা অক্ষরে
যতনে লাইন টানি।
যদি সে নৌকা আর-কোনো দেশে
আর-কারো হাতে পড়ে গিয়ে শেষে
আমার লিখন পড়িয়া তখন
বুঝিবে সে অনুমানি
কার কাছ হতে ভেসে এল স্রোতে
কাগজ-নৌকাখানি ।।
আমার নৌকা সাজাই যতনে
শিউলি বকুলে ভরি।
বাড়ির বাগানে গাছের তলায়
ছেয়ে থাকে ফুল সকাল বেলায়,
শিশিরের জল করে ঝলমল্
প্রভাতের আলো পড়ি।
সেই কুসুমের অতি ছোটো বোঝা
কোন্ দিক-পানে চলে যায় সোজা,
বেলাশেষে যদি পার হয়ে নদী
ঠেকে কোনোখানে যেয়ে -
প্রভাতের ফুল সাঁঝে পাবে কূল
কাগজের তরী বেয়ে ।।
আমার নৌকা ভাসাইয়া জলে
চেয়ে থাকি বসি তীরে।
ছোটো ছোটো ঢেউ উঠে আর পড়ে,
রবির কিরণে ঝিকিমিকি করে,
আকাশেতে পাখি চলে যায় ডাকি,
বায়ু বহে ধীরে ধীরে ।
গগনের তলে মেঘ ভাসে কত
আমারি সে ছোটো নৌকার মতো -
কে ভাসালে তায়, কোথা ভেসে যায়,
কোন দেশে গিয়ে লাগে।
ঐ মেঘ আর তরণী আমার
কে যাবে কাহার আগে ।।
বেলা হলে শেষে বাড়ি থেকে এসে
নিয়ে যায় মোরে টানি
আমি ঘরে ফিরি, থাকি কোনে মিশি,
যেথা কাটে দিন সেথা কাটে নিশি,
কোথা কোন্ গাঁয় ভেসে চলে যায়
আমার নৌকাখানি ।
কোন্ পথে যাবে কিছু নাই জানা,
কেহ তারে কভু নাহি করে মানা,
ধ'রে নাহি রাখে, ফিরে নাহি ডাকে -
ধায় নব নব দেশে।
কাগজের তরী, তারি 'পরে চড়ি
মন যায় ভেসে ভেসে ।।
রাত হয়ে আসে, শুই বিছানায়,
মুখ ঢাকি দুই হাতে -
চোখ বুঁজে ভাবি এমন আঁধার,
কালী দিয়ে ঢালা নদীর দুধার -
তারি মাঝখানে কোথায় কে জানে
নৌকা চলেছে রাতে।
আকাশের তারা মিটি মিটি করে,
শিয়াল ডাকিছে প্রহরে প্রহরে,
তরীখানি বুঝি ঘর খুঁজি খুঁজি
তীরে তীরে ফিরে ভাসি।
ঘুম লয়ে সাথে চড়েছে তাহাতে
ঘুম-পাড়ানিয়া মাসি ।।
কাগজ-নৌকাখানি।
লিখে রাখি তাতে আপনার নাম,
লিখি আমাদের বাড়ি কোন গ্রাম
বড়ো বড়ো ক'রে মোটা অক্ষরে
যতনে লাইন টানি।
যদি সে নৌকা আর-কোনো দেশে
আর-কারো হাতে পড়ে গিয়ে শেষে
আমার লিখন পড়িয়া তখন
বুঝিবে সে অনুমানি
কার কাছ হতে ভেসে এল স্রোতে
কাগজ-নৌকাখানি ।।
আমার নৌকা সাজাই যতনে
শিউলি বকুলে ভরি।
বাড়ির বাগানে গাছের তলায়
ছেয়ে থাকে ফুল সকাল বেলায়,
শিশিরের জল করে ঝলমল্
প্রভাতের আলো পড়ি।
সেই কুসুমের অতি ছোটো বোঝা
কোন্ দিক-পানে চলে যায় সোজা,
বেলাশেষে যদি পার হয়ে নদী
ঠেকে কোনোখানে যেয়ে -
প্রভাতের ফুল সাঁঝে পাবে কূল
কাগজের তরী বেয়ে ।।
আমার নৌকা ভাসাইয়া জলে
চেয়ে থাকি বসি তীরে।
ছোটো ছোটো ঢেউ উঠে আর পড়ে,
রবির কিরণে ঝিকিমিকি করে,
আকাশেতে পাখি চলে যায় ডাকি,
বায়ু বহে ধীরে ধীরে ।
গগনের তলে মেঘ ভাসে কত
আমারি সে ছোটো নৌকার মতো -
কে ভাসালে তায়, কোথা ভেসে যায়,
কোন দেশে গিয়ে লাগে।
ঐ মেঘ আর তরণী আমার
কে যাবে কাহার আগে ।।
বেলা হলে শেষে বাড়ি থেকে এসে
নিয়ে যায় মোরে টানি
আমি ঘরে ফিরি, থাকি কোনে মিশি,
যেথা কাটে দিন সেথা কাটে নিশি,
কোথা কোন্ গাঁয় ভেসে চলে যায়
আমার নৌকাখানি ।
কোন্ পথে যাবে কিছু নাই জানা,
কেহ তারে কভু নাহি করে মানা,
ধ'রে নাহি রাখে, ফিরে নাহি ডাকে -
ধায় নব নব দেশে।
কাগজের তরী, তারি 'পরে চড়ি
মন যায় ভেসে ভেসে ।।
রাত হয়ে আসে, শুই বিছানায়,
মুখ ঢাকি দুই হাতে -
চোখ বুঁজে ভাবি এমন আঁধার,
কালী দিয়ে ঢালা নদীর দুধার -
তারি মাঝখানে কোথায় কে জানে
নৌকা চলেছে রাতে।
আকাশের তারা মিটি মিটি করে,
শিয়াল ডাকিছে প্রহরে প্রহরে,
তরীখানি বুঝি ঘর খুঁজি খুঁজি
তীরে তীরে ফিরে ভাসি।
ঘুম লয়ে সাথে চড়েছে তাহাতে
ঘুম-পাড়ানিয়া মাসি ।।
বিসর্জন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুইটি কোলের ছেলে গেছে পর - পর
বয়স না হতে হতে পুরা দু - বছর ।
এবার ছেলেটি তার জন্মিল যখন
স্বামীরেও হারালো মল্লিকা । বন্ধুজন
বয়স না হতে হতে পুরা দু - বছর ।
এবার ছেলেটি তার জন্মিল যখন
স্বামীরেও হারালো মল্লিকা । বন্ধুজন
চিত্ত তোমায় নিত্য হবে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার চিত্ত তোমায় নিত্য হবে
সত্য হবে -
ওগো সত্য, আমার এখন সুদিন।
ঘটবে কবে।
সত্য সত্য সত্য জপি,
সকল বুদ্ধি সত্যে সঁপি,
সীমার বাঁধন পেরিয়ে যাব
নিখিল ভবে -
সত্য তোমার পূর্ণ প্রকাশ
দেখব কবে।
তোমায় দূরে সরিয়ে মরি
আপন অসত্যে।
কী যে কান্ড করি গো সেই
ভূতের রাজত্বে।
আমার আমি ধুয়ে মুছে
তোমার মধ্যে যাবে ঘুচে,
সত্য, তোমায় সত্য হব
বাঁচব তবে -
তোমার মধ্যে মরণ আমার
মরবে কবে।
সত্য হবে -
ওগো সত্য, আমার এখন সুদিন।
ঘটবে কবে।
সত্য সত্য সত্য জপি,
সকল বুদ্ধি সত্যে সঁপি,
সীমার বাঁধন পেরিয়ে যাব
নিখিল ভবে -
সত্য তোমার পূর্ণ প্রকাশ
দেখব কবে।
তোমায় দূরে সরিয়ে মরি
আপন অসত্যে।
কী যে কান্ড করি গো সেই
ভূতের রাজত্বে।
আমার আমি ধুয়ে মুছে
তোমার মধ্যে যাবে ঘুচে,
সত্য, তোমায় সত্য হব
বাঁচব তবে -
তোমার মধ্যে মরণ আমার
মরবে কবে।
মোহ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস,
ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস।
নদীর ওপার বসি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে;
কহে, যাহা কিছু সুখ সকলি ওপারে।
ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস।
নদীর ওপার বসি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে;
কহে, যাহা কিছু সুখ সকলি ওপারে।
ভিক্ষা ও উপার্জন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বসুমতি, কেন তুমি এতই কৃপণা,
কত খোঁড়াখুঁড়ি করি পাই শস্যকণা।
দিতে যদি হয় দে মা, প্রসন্ন সহাস—
কেন এ মাথার ঘাম পায়েতে বহাস।
বিনা চাষে শস্য দিলে কী তাহাতে ক্ষতি?
শুনিয়া ঈষৎ হাসি কন বসুমতী,
আমার গৌরব তাহে সামান্যই বাড়ে,
তোমার গৌরব তাহে নিতান্তই ছাড়ে।
কত খোঁড়াখুঁড়ি করি পাই শস্যকণা।
দিতে যদি হয় দে মা, প্রসন্ন সহাস—
কেন এ মাথার ঘাম পায়েতে বহাস।
বিনা চাষে শস্য দিলে কী তাহাতে ক্ষতি?
শুনিয়া ঈষৎ হাসি কন বসুমতী,
আমার গৌরব তাহে সামান্যই বাড়ে,
তোমার গৌরব তাহে নিতান্তই ছাড়ে।
পরিচয়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
একদিন দেখিলাম উলঙ্গ সে ছেলে
ধুলি-’পরে বসে আছে পা-দুখানি মেলে।
ঘাটে বসি মাটি ঢেলা লইয়া কুড়ায়ে
দিদি মাজিতেছে ঘটি ঘুরায়ে ঘুরায়ে।
অদূরে কোমললোম ছাগবৎস ধীরে
চরিয়া ফিরিতেছিল নদী-তীরে-তীরে।
সহসা সে কাছে আসি থাকিয়া থাকিয়া
বালকের মুখ চেয়ে উঠিল ডাকিয়া।
বালক চমকি কাঁপি কেঁদে ওঠে ত্রাসে,
দিদি ঘাটে ঘটি ফেলে ছুটে চলে আসে।
এক কক্ষে ভাই লয়ে অন্য কক্ষে ছাগ
দুজনেরে বাঁটি দিল সমান সোহাগ!
পশুশিশু, নরশিশু—দিদি মাঝে প’ড়ে
দোঁহারে বাঁধিয়া দিল পরিচয়ডোরে।
[চৈতালি]
একদিন দেখিলাম উলঙ্গ সে ছেলে
ধুলি-’পরে বসে আছে পা-দুখানি মেলে।
ঘাটে বসি মাটি ঢেলা লইয়া কুড়ায়ে
দিদি মাজিতেছে ঘটি ঘুরায়ে ঘুরায়ে।
অদূরে কোমললোম ছাগবৎস ধীরে
চরিয়া ফিরিতেছিল নদী-তীরে-তীরে।
সহসা সে কাছে আসি থাকিয়া থাকিয়া
বালকের মুখ চেয়ে উঠিল ডাকিয়া।
বালক চমকি কাঁপি কেঁদে ওঠে ত্রাসে,
দিদি ঘাটে ঘটি ফেলে ছুটে চলে আসে।
এক কক্ষে ভাই লয়ে অন্য কক্ষে ছাগ
দুজনেরে বাঁটি দিল সমান সোহাগ!
পশুশিশু, নরশিশু—দিদি মাঝে প’ড়ে
দোঁহারে বাঁধিয়া দিল পরিচয়ডোরে।
[চৈতালি]
পৃথিবী
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজ আমার প্রণতি গ্রহন করো, পৃথিবী,
শেষ নমস্কারে অবনত দিনাবসানের বেদিতলে।।
মহাবীর্যবতী তুমি বীরভোগ্যা,
বিপরীত তুমি ললিতে কঠোরে,
মিশ্রিত তোমার প্রকৃতি পুরুষে নারীতে,
মানুষের জীবন দোলায়িত কর তুমি দু:সহ দ্বন্দ্বে।
আজ আমার প্রণতি গ্রহন করো, পৃথিবী,
শেষ নমস্কারে অবনত দিনাবসানের বেদিতলে।।
মহাবীর্যবতী তুমি বীরভোগ্যা,
বিপরীত তুমি ললিতে কঠোরে,
মিশ্রিত তোমার প্রকৃতি পুরুষে নারীতে,
মানুষের জীবন দোলায়িত কর তুমি দু:সহ দ্বন্দ্বে।
পুরাতন ভৃত্য
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভূতের মতন চেহারা যেমন, নির্বোধ অতি ঘোর-
যা-কিছু হারায়, গিন্নি বলেন, 'কেষ্টা বেটাই চোর'।
উঠিতে বসিতে করি বাপান্ত, শুনেও শোনে না কানে।
যত পায় বেত না পায় বেতন, তবু না চেতন মানে।
বড়ো প্রয়োজন, ডাকি প্রাণপণ চীত্কার করি ``কেষ্টা-
যত করি তাড়া নাহি পাই সাড়া, খুঁজে ফিরি সারা দেশটা।
তিনখানা দিলে একখানা রাখে, বাকি কোথা নাহি জানে;
একখানা দিলে নিমেষ ফেলিতে তিনখানা করে আনে।
যেখানে সেখানে দিবসে দুপুরে নিদ্রাটি আছে সাধা;
মহাকলরবে গালি দেই যবে ``পাজি হতভাগা গাধা-
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সে হাসে, দেখে জ্বলে যায় পিত্ত।
তবু মায়া তার ত্যাগ করা ভার- বড়ো পুরাতন ভৃত্য।
ঘরের কর্ত্রী রুক্ষমূর্তি বলে, ``আর পারি নাকো,
রহিল তোমার এ ঘর-দুয়ার, কেষ্টারে লয়ে থাকো।
না মানে শাসন বসন বাসন অশন আসন যত
কোথায় কী গেল, শুধু টাকাগুলো যেতেছে জলের মতো।
গেলে সে বাজার সারা দিনে আর দেখা পাওয়া তার ভার-
করিলে চেষ্টা কেষ্টা ছাড়া কি ভৃত্য মেলে না আর!
শুনে মহা রেগে ছুটে যাই বেগে, আনি তার টিকি ধরে;
বলি তারে, ``পাজি, বেরো তুই আজই, দূর করে দিনু তোরে।
ধীরে চলে যায়, ভাবি গেল দায়; পরদিনে উঠে দেখি,
হুঁকাটি বাড়ায়ে রয়েছে দাঁড়ায়ে বেটা বুদ্ধির ঢেঁকি-
প্রসন্ন মুখ, নাহি কোনো দুখ, অতি অকাতর চিত্ত!
ছাড়ালে না ছাড়ে, কী করিব তারে- মোর পুরাতন ভৃত্য!
সে বছরে ফাঁকা পেনু কিছু টাকা করিয়া দালালগিরি।
করিলাম মন শ্রীবৃন্দাবন বারেক আসিব ফিরি।
পরিবার তায় সাথে যেতে চায়, বুঝায়ে বলিনু তারে-
পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য, নহিলে খরচ বাড়ে।
লয়ে রশারশি করি কষাকষি পোঁটলাপুঁটলি বাঁধি
বলয় বাজায়ে বাক্স সাজায়ে গৃহিণী কহিল কাঁদি,
``পরদেশে গিয়ে কেষ্টারে নিয়ে কষ্ট অনেক পাবে।
আমি কহিলাম, ``আরে রাম রাম! নিবারণ সাথে যাবে।
রেলগাড়ি ধায়; হেরিলাম হায় নামিয়া বর্ধমানে-
কৃষ্ণকান্ত অতি প্রশান্ত, তামাক সাজিয়া আনে!
স্পর্ধা তাহার হেনমতে আর কত বা সহিব নিত্য!
যত তারে দুষি তবু হনু খুশি হেরি পুরাতন ভৃত্য!
ভূতের মতন চেহারা যেমন, নির্বোধ অতি ঘোর-
যা-কিছু হারায়, গিন্নি বলেন, 'কেষ্টা বেটাই চোর'।
উঠিতে বসিতে করি বাপান্ত, শুনেও শোনে না কানে।
যত পায় বেত না পায় বেতন, তবু না চেতন মানে।
বড়ো প্রয়োজন, ডাকি প্রাণপণ চীত্কার করি ``কেষ্টা-
যত করি তাড়া নাহি পাই সাড়া, খুঁজে ফিরি সারা দেশটা।
তিনখানা দিলে একখানা রাখে, বাকি কোথা নাহি জানে;
একখানা দিলে নিমেষ ফেলিতে তিনখানা করে আনে।
যেখানে সেখানে দিবসে দুপুরে নিদ্রাটি আছে সাধা;
মহাকলরবে গালি দেই যবে ``পাজি হতভাগা গাধা-
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সে হাসে, দেখে জ্বলে যায় পিত্ত।
তবু মায়া তার ত্যাগ করা ভার- বড়ো পুরাতন ভৃত্য।
ঘরের কর্ত্রী রুক্ষমূর্তি বলে, ``আর পারি নাকো,
রহিল তোমার এ ঘর-দুয়ার, কেষ্টারে লয়ে থাকো।
না মানে শাসন বসন বাসন অশন আসন যত
কোথায় কী গেল, শুধু টাকাগুলো যেতেছে জলের মতো।
গেলে সে বাজার সারা দিনে আর দেখা পাওয়া তার ভার-
করিলে চেষ্টা কেষ্টা ছাড়া কি ভৃত্য মেলে না আর!
শুনে মহা রেগে ছুটে যাই বেগে, আনি তার টিকি ধরে;
বলি তারে, ``পাজি, বেরো তুই আজই, দূর করে দিনু তোরে।
ধীরে চলে যায়, ভাবি গেল দায়; পরদিনে উঠে দেখি,
হুঁকাটি বাড়ায়ে রয়েছে দাঁড়ায়ে বেটা বুদ্ধির ঢেঁকি-
প্রসন্ন মুখ, নাহি কোনো দুখ, অতি অকাতর চিত্ত!
ছাড়ালে না ছাড়ে, কী করিব তারে- মোর পুরাতন ভৃত্য!
সে বছরে ফাঁকা পেনু কিছু টাকা করিয়া দালালগিরি।
করিলাম মন শ্রীবৃন্দাবন বারেক আসিব ফিরি।
পরিবার তায় সাথে যেতে চায়, বুঝায়ে বলিনু তারে-
পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য, নহিলে খরচ বাড়ে।
লয়ে রশারশি করি কষাকষি পোঁটলাপুঁটলি বাঁধি
বলয় বাজায়ে বাক্স সাজায়ে গৃহিণী কহিল কাঁদি,
``পরদেশে গিয়ে কেষ্টারে নিয়ে কষ্ট অনেক পাবে।
আমি কহিলাম, ``আরে রাম রাম! নিবারণ সাথে যাবে।
রেলগাড়ি ধায়; হেরিলাম হায় নামিয়া বর্ধমানে-
কৃষ্ণকান্ত অতি প্রশান্ত, তামাক সাজিয়া আনে!
স্পর্ধা তাহার হেনমতে আর কত বা সহিব নিত্য!
যত তারে দুষি তবু হনু খুশি হেরি পুরাতন ভৃত্য!
অপমানিত
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হে মোর দুর্ভাগা দেশ , যাদের করেছ অপমান ,
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান!
মানুষের অধিকারে
বঞ্চিত করেছ যারে ,
সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান ,
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান ।
মানুষের পরশেরে প্রতিদিন ঠেকাইয়া দূরে
ঘৃণা করিয়াছ তুমি মানুষের প্রাণের ঠাকুরে ।
বিধাতার রুদ্ররোষে
দুর্ভিক্ষের দ্বারে বসে
ভাগ করে খেতে হবে সকলের সাথে অন্নপান ।
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান ।
তোমার আসন হতে যেথায় তাদের দিলে ঠেলে
সেথায় শক্তিরে তব নির্বাসন দিলে অবহেলে ।
চরণে দলিত হয়ে
ধুলায় সে যায় বয়ে
সে নিম্নে নেমে এসো , নহিলে নাহি রে পরিত্রাণ ।
অপমানে হতে হবে আজি তোরে সবার সমান ।
যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে
পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে ।
অজ্ঞানের অন্ধকারে
আড়ালে ঢাকিছ যারে
তোমার মঙ্গল ঢাকি গড়িছে সে ঘোর ব্যবধান ।
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান ।
শতেক শতাব্দী ধরে নামে শিরে অসম্মানভার ,
মানুষের নারায়ণে তবুও কর না নমস্কার ।
তবু নত করি আঁখি
দেখিবারে পাও না কি
নেমেছে ধুলার তলে হীন পতিতের ভগবান ,
অপমানে হতে হবে সেথা তোরে সবার সমান ।
দেখিতে পাও না তুমি মৃত্যুদূত দাঁড়ায়েছে দ্বারে ,
অভিশাপ আঁকি দিল তোমার জাতির অহংকারে ।
সবারে না যদি ডাক ‘ ,
এখনো সরিয়া থাক ‘ ,
আপনারে বেঁধে রাখ ‘ চৌদিকে জড়ায়ে অভিমান —
মৃত্যুমাঝে হবে তবে চিতাভস্মে সবার সমান ।
হে মোর দুর্ভাগা দেশ , যাদের করেছ অপমান ,
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান!
মানুষের অধিকারে
বঞ্চিত করেছ যারে ,
সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান ,
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান ।
মানুষের পরশেরে প্রতিদিন ঠেকাইয়া দূরে
ঘৃণা করিয়াছ তুমি মানুষের প্রাণের ঠাকুরে ।
বিধাতার রুদ্ররোষে
দুর্ভিক্ষের দ্বারে বসে
ভাগ করে খেতে হবে সকলের সাথে অন্নপান ।
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান ।
তোমার আসন হতে যেথায় তাদের দিলে ঠেলে
সেথায় শক্তিরে তব নির্বাসন দিলে অবহেলে ।
চরণে দলিত হয়ে
ধুলায় সে যায় বয়ে
সে নিম্নে নেমে এসো , নহিলে নাহি রে পরিত্রাণ ।
অপমানে হতে হবে আজি তোরে সবার সমান ।
যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে
পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে ।
অজ্ঞানের অন্ধকারে
আড়ালে ঢাকিছ যারে
তোমার মঙ্গল ঢাকি গড়িছে সে ঘোর ব্যবধান ।
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান ।
শতেক শতাব্দী ধরে নামে শিরে অসম্মানভার ,
মানুষের নারায়ণে তবুও কর না নমস্কার ।
তবু নত করি আঁখি
দেখিবারে পাও না কি
নেমেছে ধুলার তলে হীন পতিতের ভগবান ,
অপমানে হতে হবে সেথা তোরে সবার সমান ।
দেখিতে পাও না তুমি মৃত্যুদূত দাঁড়ায়েছে দ্বারে ,
অভিশাপ আঁকি দিল তোমার জাতির অহংকারে ।
সবারে না যদি ডাক ‘ ,
এখনো সরিয়া থাক ‘ ,
আপনারে বেঁধে রাখ ‘ চৌদিকে জড়ায়ে অভিমান —
মৃত্যুমাঝে হবে তবে চিতাভস্মে সবার সমান ।
হঠাৎ দেখা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা ,
ভাবি নি সম্ভব হবে কোনোদিন ।
আগে ওকে বারবার দেখেছি
লালরঙের শাড়িতে
দালিম ফুলের মতো রাঙা ;
আজ পরেছে কালো রেশমের কাপড় ,
আঁচল তুলেছে মাথায়
দোলনচাঁপার মতো চিকনগৌর মুখখানি ঘিরে ।
মনে হল , কালো রঙে একটা গভীর দূরত্ব
ঘনিয়ে নিয়েছে নিজের চার দিকে ,
যে দূরত্ব সর্ষেখেতের শেষ সীমানায়
শালবনের নীলাঞ্জনে ।
থমকে গেল আমার সমস্ত মনটা ;
চেনা লোককে দেখলেম অচেনার গাম্ভীর্যে ।
হঠাৎ খবরের কাগজ ফেলে দিয়ে
আমাকে করলে নমস্কার ।
সমাজবিধির পথ গেল খুলে ,
আলাপ করলেম শুরু —
কেমন আছ , কেমন চলছে সংসার
ইত্যাদি ।
সে রইল জানলার বাইরের দিকে চেয়ে
যেন কাছের দিনের ছোঁয়াচ – পার – হওয়া চাহনিতে ।
দিলে অত্যন্ত ছোটো দুটো – একটা জবাব ,
কোনোটা বা দিলেই না ।
বুঝিয়ে দিলে হাতের অস্থিরতায় —
কেন এ – সব কথা ,
এর চেয়ে অনেক ভালো চুপ করে থাকা ।
আমি ছিলেম অন্য বেঞ্চিতে
ওর সাথিদের সঙ্গে ।
এক সময়ে আঙুল নেড়ে জানালে কাছে আসতে ।
মনে হল কম সাহস নয় ;
বসলুম ওর এক – বেঞ্চিতে ।
গাড়ির আওয়াজের আড়ালে
বললে মৃদুস্বরে ,
“ কিছু মনে কোরো না ,
সময় কোথা সময় নষ্ট করবার ।
আমাকে নামতে হবে পরের স্টেশনেই ;
দূরে যাবে তুমি ,
দেখা হবে না আর কোনোদিনই ।
তাই যে প্রশ্নটার জবাব এতকাল থেমে আছে ,
শুনব তোমার মুখে ।
সত্য করে বলবে তো ?
আমি বললেম , “ বলব । ”
বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়েই শুধোল ,
“ আমাদের গেছে যে দিন
একেবারেই কি গেছে ,
কিছুই কি নেই বাকি । ”
একটুকু রইলেম চুপ করে ;
তারপর বললেম ,
“ রাতের সব তারাই আছে
দিনের আলোর গভীরে । ”
খটকা লাগল , কী জানি বানিয়ে বললেম না কি ।
ও বললে , “ থাক্ , এখন যাও ও দিকে । ”
সবাই নেমে গেল পরের স্টেশনে ;
আমি চললেম একা ।
রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা ,
ভাবি নি সম্ভব হবে কোনোদিন ।
আগে ওকে বারবার দেখেছি
লালরঙের শাড়িতে
দালিম ফুলের মতো রাঙা ;
আজ পরেছে কালো রেশমের কাপড় ,
আঁচল তুলেছে মাথায়
দোলনচাঁপার মতো চিকনগৌর মুখখানি ঘিরে ।
মনে হল , কালো রঙে একটা গভীর দূরত্ব
ঘনিয়ে নিয়েছে নিজের চার দিকে ,
যে দূরত্ব সর্ষেখেতের শেষ সীমানায়
শালবনের নীলাঞ্জনে ।
থমকে গেল আমার সমস্ত মনটা ;
চেনা লোককে দেখলেম অচেনার গাম্ভীর্যে ।
হঠাৎ খবরের কাগজ ফেলে দিয়ে
আমাকে করলে নমস্কার ।
সমাজবিধির পথ গেল খুলে ,
আলাপ করলেম শুরু —
কেমন আছ , কেমন চলছে সংসার
ইত্যাদি ।
সে রইল জানলার বাইরের দিকে চেয়ে
যেন কাছের দিনের ছোঁয়াচ – পার – হওয়া চাহনিতে ।
দিলে অত্যন্ত ছোটো দুটো – একটা জবাব ,
কোনোটা বা দিলেই না ।
বুঝিয়ে দিলে হাতের অস্থিরতায় —
কেন এ – সব কথা ,
এর চেয়ে অনেক ভালো চুপ করে থাকা ।
আমি ছিলেম অন্য বেঞ্চিতে
ওর সাথিদের সঙ্গে ।
এক সময়ে আঙুল নেড়ে জানালে কাছে আসতে ।
মনে হল কম সাহস নয় ;
বসলুম ওর এক – বেঞ্চিতে ।
গাড়ির আওয়াজের আড়ালে
বললে মৃদুস্বরে ,
“ কিছু মনে কোরো না ,
সময় কোথা সময় নষ্ট করবার ।
আমাকে নামতে হবে পরের স্টেশনেই ;
দূরে যাবে তুমি ,
দেখা হবে না আর কোনোদিনই ।
তাই যে প্রশ্নটার জবাব এতকাল থেমে আছে ,
শুনব তোমার মুখে ।
সত্য করে বলবে তো ?
আমি বললেম , “ বলব । ”
বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়েই শুধোল ,
“ আমাদের গেছে যে দিন
একেবারেই কি গেছে ,
কিছুই কি নেই বাকি । ”
একটুকু রইলেম চুপ করে ;
তারপর বললেম ,
“ রাতের সব তারাই আছে
দিনের আলোর গভীরে । ”
খটকা লাগল , কী জানি বানিয়ে বললেম না কি ।
ও বললে , “ থাক্ , এখন যাও ও দিকে । ”
সবাই নেমে গেল পরের স্টেশনে ;
আমি চললেম একা ।
অনন্ত প্রেম
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি
শত রূপে শত বার
জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার।
চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয়
গাঁথিয়াছে গীতহার,
কত রূপ ধরে পরেছ গলায়,
নিয়েছ সে উপহার
জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার।
যত শুনি সেই অতীত কাহিনী,
প্রাচীন প্রেমের ব্যথা,
অতি পুরাতন বিরহমিলনকথা,
অসীম অতীতে চাহিতে চাহিতে
দেখা দেয় অবশেষে
কালের তিমিররজনী ভেদিয়া
তোমারি মুরতি এসে,
চিরস্মৃতিময়ী ধ্রুবতারকার বেশে।
আমরা দুজনে ভাসিয়া এসেছি
যুগল প্রেমের স্রোতে
অনাদিকালের হৃদয়-উৎস হতে।
আমরা দুজনে করিয়াছি খেলা
কোটি প্রেমিকের মাঝে
বিরহবিধুর নয়নসলিলে,
মিলনমধুর লাজে—
পুরাতন প্রেম নিত্যনূতন সাজে।
আজি সেই চিরদিবসের প্রেম
অবসান লভিয়াছে
রাশি রাশি হয়ে তোমার পায়ের কাছে।
নিখিলের সুখ, নিখিলের দুখ,
নিখিল প্রাণের প্রীতি,
একটি প্রেমের মাঝারে মিশেছে
সকল প্রেমের স্মৃতি—
সকল কালের সকল কবির গীতি।
শত রূপে শত বার
জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার।
চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয়
গাঁথিয়াছে গীতহার,
কত রূপ ধরে পরেছ গলায়,
নিয়েছ সে উপহার
জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার।
যত শুনি সেই অতীত কাহিনী,
প্রাচীন প্রেমের ব্যথা,
অতি পুরাতন বিরহমিলনকথা,
অসীম অতীতে চাহিতে চাহিতে
দেখা দেয় অবশেষে
কালের তিমিররজনী ভেদিয়া
তোমারি মুরতি এসে,
চিরস্মৃতিময়ী ধ্রুবতারকার বেশে।
আমরা দুজনে ভাসিয়া এসেছি
যুগল প্রেমের স্রোতে
অনাদিকালের হৃদয়-উৎস হতে।
আমরা দুজনে করিয়াছি খেলা
কোটি প্রেমিকের মাঝে
বিরহবিধুর নয়নসলিলে,
মিলনমধুর লাজে—
পুরাতন প্রেম নিত্যনূতন সাজে।
আজি সেই চিরদিবসের প্রেম
অবসান লভিয়াছে
রাশি রাশি হয়ে তোমার পায়ের কাছে।
নিখিলের সুখ, নিখিলের দুখ,
নিখিল প্রাণের প্রীতি,
একটি প্রেমের মাঝারে মিশেছে
সকল প্রেমের স্মৃতি—
সকল কালের সকল কবির গীতি।
বৃক্ষবন্দনা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অন্ধ ভূমিগর্ভ হতে শুনেছিলে সূর্যের আহ্বান
প্রাণের প্রথম জাগরণে , তুমি বৃক্ষ , আদিপ্রাণ ;
ঊর্ধ্বশীর্ষে উচ্চারিলে আলোকের প্রথম বন্দনা
ছন্দোহীন পাষাণের বক্ষ- ' পরে ; আনিলে বেদনা
নিঃসাড় নিষ্ঠুর মরুস্থলে ।
সেদিন অম্বর-মাঝে
শ্যামে নীলে মিশ্রমন্ত্রে স্বর্গলোকে জ্যোতিষ্কসমাজে
মর্তের মাহাত্ম্যগান করিলে ঘোষণা । যে জীবন
মরণতোরণদ্বার বারংবার করি উত্তরণ
যাত্রা করে যুগে যুগে অনন্তকালের তীর্থপথে
নব নব পান্থশালে বিচিত্র নূতন দেহরথে ,
তাহারি বিজয়ধ্বজা উড়াইলে নিঃশঙ্ক গৌরবে
অজ্ঞাতের সম্মুখে দাঁড়ায়ে । তোমার নিঃশব্দ রবে
প্রথম ভেঙেছে স্বপ্ন ধরিত্রীর , চমকি উল্লসি
নিজেরে পড়েছে তার মনে — দেবকন্যা দুঃসাহসী
কবে যাত্রা করেছিল জ্যোতিঃস্বর্গ ছাড়ি দীনবেশে
পাংশুম্লান গৈরিকবসন-পরা , খণ্ড কালে দেশে
অমরার আনন্দেরে খণ্ড খণ্ড ভোগ করিবারে ,
দুঃখের সংঘাতে তারে বিদীর্ণ করিয়া বারে বারে
নিবিড় করিয়া পেতে ।
মৃত্তিকার হে বীর সন্তান ,
সংগ্রাম ঘোষিলে তুমি মৃত্তিকারে দিতে মুক্তিদান
মরুর দারুণ দুর্গ হতে ; যুদ্ধ চলে ফিরে ফিরে ;
সন্তরি সমুদ্র-ঊর্মি দুর্গম দ্বীপের শূন্য তীরে
শ্যামলের সিংহাসন প্রতিষ্ঠিলে অদম্য নিষ্ঠায় ,
দুস্তর শৈলের বক্ষে প্রস্তরের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়
বিজয়-আখ্যানলিপি লিখি দিলে পল্লব-অক্ষরে
ধূলিরে করিয়া মুগ্ধ , চিহ্নহীন প্রান্তরে প্রান্তরে
ব্যাপিলে আপন পন্থা ।
বাণীশূন্য ছিল একদিন
জলস্থল শূন্যতল , ঋতুর উৎসবমন্ত্রহীন —
শাখায় রচিলে তব সংগীতের আদিম আশ্রয় ,
যে গানে চঞ্চল বায়ু নিজের লভিল পরিচয় ,
সুরের বিচিত্র বর্ণে আপনার দৃশ্যহীন তনু
রঞ্জিত করিয়া নিল , অঙ্কিল গানের ইন্দ্রধনু
উত্তরীর প্রান্তে প্রান্তে । সুন্দরের প্রাণমূর্তিখানি
মৃত্তিকার মর্তপটে দিলে তুমি প্রথম বাখানি
টানিয়া আপন প্রাণে রূপশক্তি সূর্যলোক হতে ,
আলোকের গুপ্তধন বর্ণে বর্ণে বর্ণিলে আলোতে ।
ইন্দ্রের অপ্সরী আসি মেঘে হানিয়া কঙ্কণ
বাষ্পপাত্র চূর্ণ করি লীলানৃত্যে করেছে বর্ষণ
যৌবন - অমৃতরস , তুমি তাই নিলে ভরি ভরি
আপনার পুত্রপুষ্পপুটে , অনন্তযৌবনা করি
সাজাইলে বসুন্ধরা ।
হে নিস্তব্ধ , হে মহাগম্ভীর ,
বীর্যেরে বাঁধিয়া ধৈর্যে শান্তিরূপ দেখালে শক্তির ;
তাই আসি তোমার আশ্রয়ে শান্তিদীক্ষা লভিবারে ,
শুনিতে মৌনের মহাবানী ; দুশ্চিন্তার গুরুভারে
নতশীর্ষ বিলুণ্ঠিতে শ্যামসৌম্যচ্ছায়াতলে তব —
প্রাণের উদার রূপ , রসরূপ নিত্য নব নব ,
বিশ্বজয়ী বীররূপ ধরণীর , বাণীরূপ তার
লভিতে আপন প্রাণে । ধ্যানবলে তোমার মাঝার
গেছি আমি , জেনেছি , সূর্যের বক্ষে জ্বলে বহ্নিরূপে
সৃষ্টিযজ্ঞে যেই হোম , তোমার সত্তায় চুপে চুপে
ধরে তাই শ্যাম স্নিগ্ধরূপ ; ওগো সূর্যরশ্মিপায়ী ,
শত শত শতাব্দীর দিনধেনু দুহিয়া সদাই
যে তেজে ভরিলে মজ্জা , মানবেরে তাই করি দান
করেছ জগৎজয়ী ; দিলে তারে পরম সম্মান ;
হয়েছে সে দেবতার প্রতিস্পর্ধী — সে অগ্নিচ্ছটায়
প্রদীপ্ত তাহার শক্তি বিশ্বতলে বিস্ময় ঘটায়
ভেদিয়া দুঃসাধ্য বিঘ্নবাধা । তব প্রাণে প্রাণবান ,
তব স্নেহচ্ছায়ায় শীতল , তব তেজে তেজীয়ান ,
সজ্জিত তোমার মাল্যে যে মানব , তারি দূত হয়ে
ওগো মানবের বন্ধু , আজি এই কাব্য-অর্ঘ্য ল'য়ে
শ্যামের বাঁশির তানে মুগ্ধ কবি আমি
অর্পিলাম তোমায় প্রণামী ।
অন্ধ ভূমিগর্ভ হতে শুনেছিলে সূর্যের আহ্বান
প্রাণের প্রথম জাগরণে , তুমি বৃক্ষ , আদিপ্রাণ ;
ঊর্ধ্বশীর্ষে উচ্চারিলে আলোকের প্রথম বন্দনা
ছন্দোহীন পাষাণের বক্ষ- ' পরে ; আনিলে বেদনা
নিঃসাড় নিষ্ঠুর মরুস্থলে ।
সেদিন অম্বর-মাঝে
শ্যামে নীলে মিশ্রমন্ত্রে স্বর্গলোকে জ্যোতিষ্কসমাজে
মর্তের মাহাত্ম্যগান করিলে ঘোষণা । যে জীবন
মরণতোরণদ্বার বারংবার করি উত্তরণ
যাত্রা করে যুগে যুগে অনন্তকালের তীর্থপথে
নব নব পান্থশালে বিচিত্র নূতন দেহরথে ,
তাহারি বিজয়ধ্বজা উড়াইলে নিঃশঙ্ক গৌরবে
অজ্ঞাতের সম্মুখে দাঁড়ায়ে । তোমার নিঃশব্দ রবে
প্রথম ভেঙেছে স্বপ্ন ধরিত্রীর , চমকি উল্লসি
নিজেরে পড়েছে তার মনে — দেবকন্যা দুঃসাহসী
কবে যাত্রা করেছিল জ্যোতিঃস্বর্গ ছাড়ি দীনবেশে
পাংশুম্লান গৈরিকবসন-পরা , খণ্ড কালে দেশে
অমরার আনন্দেরে খণ্ড খণ্ড ভোগ করিবারে ,
দুঃখের সংঘাতে তারে বিদীর্ণ করিয়া বারে বারে
নিবিড় করিয়া পেতে ।
মৃত্তিকার হে বীর সন্তান ,
সংগ্রাম ঘোষিলে তুমি মৃত্তিকারে দিতে মুক্তিদান
মরুর দারুণ দুর্গ হতে ; যুদ্ধ চলে ফিরে ফিরে ;
সন্তরি সমুদ্র-ঊর্মি দুর্গম দ্বীপের শূন্য তীরে
শ্যামলের সিংহাসন প্রতিষ্ঠিলে অদম্য নিষ্ঠায় ,
দুস্তর শৈলের বক্ষে প্রস্তরের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়
বিজয়-আখ্যানলিপি লিখি দিলে পল্লব-অক্ষরে
ধূলিরে করিয়া মুগ্ধ , চিহ্নহীন প্রান্তরে প্রান্তরে
ব্যাপিলে আপন পন্থা ।
বাণীশূন্য ছিল একদিন
জলস্থল শূন্যতল , ঋতুর উৎসবমন্ত্রহীন —
শাখায় রচিলে তব সংগীতের আদিম আশ্রয় ,
যে গানে চঞ্চল বায়ু নিজের লভিল পরিচয় ,
সুরের বিচিত্র বর্ণে আপনার দৃশ্যহীন তনু
রঞ্জিত করিয়া নিল , অঙ্কিল গানের ইন্দ্রধনু
উত্তরীর প্রান্তে প্রান্তে । সুন্দরের প্রাণমূর্তিখানি
মৃত্তিকার মর্তপটে দিলে তুমি প্রথম বাখানি
টানিয়া আপন প্রাণে রূপশক্তি সূর্যলোক হতে ,
আলোকের গুপ্তধন বর্ণে বর্ণে বর্ণিলে আলোতে ।
ইন্দ্রের অপ্সরী আসি মেঘে হানিয়া কঙ্কণ
বাষ্পপাত্র চূর্ণ করি লীলানৃত্যে করেছে বর্ষণ
যৌবন - অমৃতরস , তুমি তাই নিলে ভরি ভরি
আপনার পুত্রপুষ্পপুটে , অনন্তযৌবনা করি
সাজাইলে বসুন্ধরা ।
হে নিস্তব্ধ , হে মহাগম্ভীর ,
বীর্যেরে বাঁধিয়া ধৈর্যে শান্তিরূপ দেখালে শক্তির ;
তাই আসি তোমার আশ্রয়ে শান্তিদীক্ষা লভিবারে ,
শুনিতে মৌনের মহাবানী ; দুশ্চিন্তার গুরুভারে
নতশীর্ষ বিলুণ্ঠিতে শ্যামসৌম্যচ্ছায়াতলে তব —
প্রাণের উদার রূপ , রসরূপ নিত্য নব নব ,
বিশ্বজয়ী বীররূপ ধরণীর , বাণীরূপ তার
লভিতে আপন প্রাণে । ধ্যানবলে তোমার মাঝার
গেছি আমি , জেনেছি , সূর্যের বক্ষে জ্বলে বহ্নিরূপে
সৃষ্টিযজ্ঞে যেই হোম , তোমার সত্তায় চুপে চুপে
ধরে তাই শ্যাম স্নিগ্ধরূপ ; ওগো সূর্যরশ্মিপায়ী ,
শত শত শতাব্দীর দিনধেনু দুহিয়া সদাই
যে তেজে ভরিলে মজ্জা , মানবেরে তাই করি দান
করেছ জগৎজয়ী ; দিলে তারে পরম সম্মান ;
হয়েছে সে দেবতার প্রতিস্পর্ধী — সে অগ্নিচ্ছটায়
প্রদীপ্ত তাহার শক্তি বিশ্বতলে বিস্ময় ঘটায়
ভেদিয়া দুঃসাধ্য বিঘ্নবাধা । তব প্রাণে প্রাণবান ,
তব স্নেহচ্ছায়ায় শীতল , তব তেজে তেজীয়ান ,
সজ্জিত তোমার মাল্যে যে মানব , তারি দূত হয়ে
ওগো মানবের বন্ধু , আজি এই কাব্য-অর্ঘ্য ল'য়ে
শ্যামের বাঁশির তানে মুগ্ধ কবি আমি
অর্পিলাম তোমায় প্রণামী ।
সবুজের অভিযান
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ওরে নবীন , ওরে আমার কাঁচা ,
ওরে সবুজ , ওরে অবুঝ ,
আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা ।
রক্ত আলোর মদে মাতাল ভোরে
আজকে যে যা বলে বলুক তোরে ,
সকল তর্ক হেলায় তুচ্ছ ক ' রে
পুচ্ছটি তোর উচ্চে তুলে নাচা ।
আয় দুরন্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।
খাঁচাখানা দুলছে মৃদু হাওয়ায় ;
আর তো কিছুই নড়ে না রে
ওদের ঘরে , ওদের ঘরের দাওয়ায় ।
ওই যে প্রবীণ , ওই যে পরম পাকা ,
চক্ষু - কর্ণ দুইটি ডানায় ঢাকা ,
ঝিমায় যেন চিত্রপটে আঁকা
অন্ধকারে বন্ধ করা খাঁচায় ।
আয় জীবন্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।
বাহিরপানে তাকায় না যে কেউ ,
দেখে না যে বাণ ডেকেছে
জোয়ার-জলে উঠছে প্রবল ঢেউ ।
চলতে ওরা চায় না মাটির ছেলে
মাটির'পরে চরণ ফেলে ফেলে ,
আছে অচল আসনখানা মেলে
যে যার আপন উচ্চ বাঁশের মাচায় ,
আয় অশান্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।
তোরে হেথায় করবে সবাই মানা ।
হঠাৎ আলো দেখবে যখন
ভাববে এ কী বিষম কাণ্ডখানা ।
সংঘাতে তোর উঠবে ওরা রেগে ,
শয়ন ছেড়ে আসবে ছুটে বেগে ,
সেই সুযোগে ঘুমের থেকে জেগে
লাগবে লড়াই মিথ্যা এবং সাঁচায় ।
আয় প্রচণ্ড , আয় রে আমার কাঁচা ।
শিকল-দেবীর ওই যে পূজাবেদী
চিরকাল কি রইবে খাড়া ।
পাগলামি তুই আয় রে দুয়ার ভেদি ।
ঝড়ের মাতন , বিজয়-কেতন নেড়ে
অট্টহাস্যে আকাশখানা ফেড়ে ,
ভোলানাথের ঝোলাঝুলি ঝেড়ে
ভুলগুলো সব আন্ রে বাছা-বাছা ।
আয় প্রমত্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।
আন্ রে টেনে বাঁধা-পথের শেষে ।
বিবাগী কর্ অবাধপানে ,
পথ কেটে যাই অজানাদের দেশে ।
আপদ আছে , জানি আ ঘাত আছে ,
তাই জেনে তো বক্ষে পরান নাচে ,
ঘুচিয়ে দে ভাই পুঁথি-পোড়োর কাছে
পথে চলার বিধিবিধান যাচা ।
আয় প্রমুক্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।
চিরযুবা তুই যে চিরজীবী ,
জীর্ণ জরা ঝরিয়ে দিয়ে
প্রাণ অফুরান ছড়িয়ে দেদার দিবি ।
সবুজ নেশায় ভোর করেছি ধরা ,
ঝড়ের মেঘে তোর ই তড়িৎ ভরা ,
বসন্তেরে পরাস আকুল-করা
আপন গলার বকুল-মাল্যগাছা ,
আয় রে অমর , আয় রে আমার কাঁচা ।
ওরে নবীন , ওরে আমার কাঁচা ,
ওরে সবুজ , ওরে অবুঝ ,
আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা ।
রক্ত আলোর মদে মাতাল ভোরে
আজকে যে যা বলে বলুক তোরে ,
সকল তর্ক হেলায় তুচ্ছ ক ' রে
পুচ্ছটি তোর উচ্চে তুলে নাচা ।
আয় দুরন্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।
খাঁচাখানা দুলছে মৃদু হাওয়ায় ;
আর তো কিছুই নড়ে না রে
ওদের ঘরে , ওদের ঘরের দাওয়ায় ।
ওই যে প্রবীণ , ওই যে পরম পাকা ,
চক্ষু - কর্ণ দুইটি ডানায় ঢাকা ,
ঝিমায় যেন চিত্রপটে আঁকা
অন্ধকারে বন্ধ করা খাঁচায় ।
আয় জীবন্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।
বাহিরপানে তাকায় না যে কেউ ,
দেখে না যে বাণ ডেকেছে
জোয়ার-জলে উঠছে প্রবল ঢেউ ।
চলতে ওরা চায় না মাটির ছেলে
মাটির'পরে চরণ ফেলে ফেলে ,
আছে অচল আসনখানা মেলে
যে যার আপন উচ্চ বাঁশের মাচায় ,
আয় অশান্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।
তোরে হেথায় করবে সবাই মানা ।
হঠাৎ আলো দেখবে যখন
ভাববে এ কী বিষম কাণ্ডখানা ।
সংঘাতে তোর উঠবে ওরা রেগে ,
শয়ন ছেড়ে আসবে ছুটে বেগে ,
সেই সুযোগে ঘুমের থেকে জেগে
লাগবে লড়াই মিথ্যা এবং সাঁচায় ।
আয় প্রচণ্ড , আয় রে আমার কাঁচা ।
শিকল-দেবীর ওই যে পূজাবেদী
চিরকাল কি রইবে খাড়া ।
পাগলামি তুই আয় রে দুয়ার ভেদি ।
ঝড়ের মাতন , বিজয়-কেতন নেড়ে
অট্টহাস্যে আকাশখানা ফেড়ে ,
ভোলানাথের ঝোলাঝুলি ঝেড়ে
ভুলগুলো সব আন্ রে বাছা-বাছা ।
আয় প্রমত্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।
আন্ রে টেনে বাঁধা-পথের শেষে ।
বিবাগী কর্ অবাধপানে ,
পথ কেটে যাই অজানাদের দেশে ।
আপদ আছে , জানি আ ঘাত আছে ,
তাই জেনে তো বক্ষে পরান নাচে ,
ঘুচিয়ে দে ভাই পুঁথি-পোড়োর কাছে
পথে চলার বিধিবিধান যাচা ।
আয় প্রমুক্ত , আয় রে আমার কাঁচা ।
চিরযুবা তুই যে চিরজীবী ,
জীর্ণ জরা ঝরিয়ে দিয়ে
প্রাণ অফুরান ছড়িয়ে দেদার দিবি ।
সবুজ নেশায় ভোর করেছি ধরা ,
ঝড়ের মেঘে তোর ই তড়িৎ ভরা ,
বসন্তেরে পরাস আকুল-করা
আপন গলার বকুল-মাল্যগাছা ,
আয় রে অমর , আয় রে আমার কাঁচা ।
দুই বিঘা জমি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শুধু বিঘে দুই ছিল মোর ভুঁই আর সবই গেছে ঋণে ।
বাবু বলিলেন , ‘ বুঝেছ উপেন , এ জমি লইব কিনে । '
কহিলাম আমি , ‘ তুমি ভূস্বামী , ভূমির অন্ত নাই ।
চেয়ে দেখো মোর আছে বড়ো - জোর মরিবার মতো ঠাঁই । '
শুনি রাজা কহে , ‘ বাপু , জানো তো হে , করেছি বাগানখানা
পেলে দুই বিঘে প্রস্থ ও দিঘে সমান হইবে টানা —
ওটা দিতে হবে । ' কহিলাম তবে বক্ষে জুড়িয়া পাণি
সজল চক্ষে , ‘ করুণ রক্ষে গরিবের ভিটেখানি ।
সপ্ত পুরুষ যেথায় মানুষ সে মাটি সোনার বাড়া ,
দৈন্যের দায়ে বেচিব সে মায়ে এমনি লক্ষ্মীছাড়া ! '
আঁখি করি লাল রাজা ক্ষণকাল রহিল মৌনভাবে ,
কহিলেন শেষে ক্রূর হাসি হেসে , ‘ আচ্ছা , সে দেখা যাবে । '
পরে মাস দেড়ে ভিটে মাটি ছেড়ে বাহির হইনু পথে —
করিল ডিক্রি , সকলই বিক্রি মিথ্যা দেনার খতে ।
এ জগতে , হায় , সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি —
রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি ।
মনে ভাবিলাম মোরে ভগবান রাখিবে না মোহগর্তে ,
তাই লিখি দিল বিশ্বনিখিল দু বিঘার পরিবর্তে ।
সন্ন্যাসীবেশে ফিরি দেশে দেশে হইয়া সাধুর শিষ্য
কত হেরিলাম মনোহর ধাম , কত মনোরম দৃশ্য !
ভূধরে সাগরে বিজনে নগরে যখন যেখানে ভ্রমি
তবু নিশিদিনে ভুলিতে পারি নে সেই দুই বিঘা জমি ।
হাটে মাঠে বাটে এই মতো কাটে বছর পনেরো - ষোলো —
একদিন শেষে ফিরিবারে দেশে বড়ই বাসনা হল ।
নমোনমো নম সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি !
গঙ্গার তীর স্নিগ্ধ সমীর , জীবন জুড়ালে তুমি ।
অবারিত মাঠ , গগনললাট চুমে তব পদধূলি ,
ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটো ছোটো গ্রামগুলি ।
পল্লবঘন আম্রকানন রাখালের খেলাগেহ ,
স্তব্ধ অতল দিঘি কালোজল — নিশীথশীতল স্নেহ ।
বুকভরা মধু বঙ্গের বধূ জল লয়ে যায় ঘরে —
মা বলিতে প্রাণ করে আনচান , চোখে আসে জল ভরে ।
দুই দিন পরে দ্বিতীয় প্রহরে প্রবেশিনু নিজগ্রামে —
কুমোরের বাড়ি দক্ষিণে ছাড়ি রথতলা করি বামে ,
রাখি হাটখোলা , নন্দীর গোলা , মন্দির করি পাছে
তৃষাতুর শেষে পঁহুছিনু এসে আমার বাড়ির কাছে ।
ধিক্ ধিক্ ওরে , শতধিক্ তোরে , নিলাজ কুলটা ভূমি !
যখনি যাহার তখনি তাহার , এই কি জননী তুমি !
সে কি মনে হবে একদিন যবে ছিলে দরিদ্রমাতা
আঁচল ভরিয়া রাখিতে ধরিয়া ফল ফুল শাক পাতা !
আজ কোন্ রীতে কারে ভুলাইতে ধরেছ বিলাসবেশ —
পাঁচরঙা পাতা অঞ্চলে গাঁথা , পুষ্পে খচিত কেশ !
আমি তোর লাগি ফিরেছি বিবাগি গৃহহারা সুখহীন —
তুই হেথা বসি ওরে রাক্ষসী , হাসিয়া কাটাস দিন !
ধনীর আদরে গরব না ধরে! এতই হয়েছ ভিন্ন
কোনোখানে লেশ নাহি অবশেষ সেদিনের কোনো চিহ্ন !
কল্যাণময়ী ছিলে তুমি অয়ি , ক্ষুধাহরা সুধারাশি !
যত হাসো আজ যত করো সাজ ছিলে দেবী , হলে দাসী ।
বিদীর্ণ হিয়া ফিরিয়া ফিরিয়া চারি দিকে চেয়ে দেখি —
প্রাচীরের কাছে এখনো যে আছে , সেই আমগাছ একি !
বসি তার তলে নয়নের জলে শান্ত হইল ব্যথা ,
একে একে মনে উদিল স্মরণে বালক - কালের কথা ।
সেই মনে পড়ে জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে রাত্রে নাহিকো ঘুম ,
অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি আম কুড়াবার ধুম ।
সেই সুমধুর স্তব্ধ দুপুর , পাঠশালা - পলায়ন —
ভাবিলাম হায় আর কি কোথায় ফিরে পাব সে জীবন !
সহসা বাতাস ফেলি গেল শ্বাস শাখা দুলাইয়া গাছে ,
দুটি পাকা ফল লভিল ভূতল আমার কোলের কাছে ।
ভাবিলাম মনে বুঝি এতখনে আমারে চিনিল মাতা ,
স্নেহের সে দানে বহু সম্মানে বারেক ঠেকানু মাথা ।
হেনকালে হায় যমদূত - প্রায় কোথা হতে এল মালী ,
ঝুঁটি - বাঁধা উড়ে সপ্তম সুরে পাড়িতে লাগিল গালি ।
কহিলাম তবে , ‘ আমি তো নীরবে দিয়েছি আমার সব —
দুটি ফল তার করি অধিকার , এত তারি কলরব ! '
চিনিল না মোরে , নিয়ে গেল ধরে কাঁধে তুলি লাঠিগাছ —
বাবু ছিপ হাতে পারিষদ - সাথে ধরিতেছিলেন মাছ ।
শুনি বিবরণ ক্রোধে তিনি কন , ‘ মারিয়া করিব খুন ! '
বাবু যত বলে পারিষদ - দলে বলে তার শতগুণ ।
আমি কহিলাম , ‘ শুধু দুটি আম ভিখ মাগি মহাশয় ! '
বাবু কহে হেসে , ‘ বেটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয় । '
আমি শুনে হাসি আঁখিজলে ভাসি , এই ছিল মোর ঘটে —
তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ , আমি আজ চোর বটে !
[কাহিনী]
শুধু বিঘে দুই ছিল মোর ভুঁই আর সবই গেছে ঋণে ।
বাবু বলিলেন , ‘ বুঝেছ উপেন , এ জমি লইব কিনে । '
কহিলাম আমি , ‘ তুমি ভূস্বামী , ভূমির অন্ত নাই ।
চেয়ে দেখো মোর আছে বড়ো - জোর মরিবার মতো ঠাঁই । '
শুনি রাজা কহে , ‘ বাপু , জানো তো হে , করেছি বাগানখানা
পেলে দুই বিঘে প্রস্থ ও দিঘে সমান হইবে টানা —
ওটা দিতে হবে । ' কহিলাম তবে বক্ষে জুড়িয়া পাণি
সজল চক্ষে , ‘ করুণ রক্ষে গরিবের ভিটেখানি ।
সপ্ত পুরুষ যেথায় মানুষ সে মাটি সোনার বাড়া ,
দৈন্যের দায়ে বেচিব সে মায়ে এমনি লক্ষ্মীছাড়া ! '
আঁখি করি লাল রাজা ক্ষণকাল রহিল মৌনভাবে ,
কহিলেন শেষে ক্রূর হাসি হেসে , ‘ আচ্ছা , সে দেখা যাবে । '
পরে মাস দেড়ে ভিটে মাটি ছেড়ে বাহির হইনু পথে —
করিল ডিক্রি , সকলই বিক্রি মিথ্যা দেনার খতে ।
এ জগতে , হায় , সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি —
রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি ।
মনে ভাবিলাম মোরে ভগবান রাখিবে না মোহগর্তে ,
তাই লিখি দিল বিশ্বনিখিল দু বিঘার পরিবর্তে ।
সন্ন্যাসীবেশে ফিরি দেশে দেশে হইয়া সাধুর শিষ্য
কত হেরিলাম মনোহর ধাম , কত মনোরম দৃশ্য !
ভূধরে সাগরে বিজনে নগরে যখন যেখানে ভ্রমি
তবু নিশিদিনে ভুলিতে পারি নে সেই দুই বিঘা জমি ।
হাটে মাঠে বাটে এই মতো কাটে বছর পনেরো - ষোলো —
একদিন শেষে ফিরিবারে দেশে বড়ই বাসনা হল ।
নমোনমো নম সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি !
গঙ্গার তীর স্নিগ্ধ সমীর , জীবন জুড়ালে তুমি ।
অবারিত মাঠ , গগনললাট চুমে তব পদধূলি ,
ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটো ছোটো গ্রামগুলি ।
পল্লবঘন আম্রকানন রাখালের খেলাগেহ ,
স্তব্ধ অতল দিঘি কালোজল — নিশীথশীতল স্নেহ ।
বুকভরা মধু বঙ্গের বধূ জল লয়ে যায় ঘরে —
মা বলিতে প্রাণ করে আনচান , চোখে আসে জল ভরে ।
দুই দিন পরে দ্বিতীয় প্রহরে প্রবেশিনু নিজগ্রামে —
কুমোরের বাড়ি দক্ষিণে ছাড়ি রথতলা করি বামে ,
রাখি হাটখোলা , নন্দীর গোলা , মন্দির করি পাছে
তৃষাতুর শেষে পঁহুছিনু এসে আমার বাড়ির কাছে ।
ধিক্ ধিক্ ওরে , শতধিক্ তোরে , নিলাজ কুলটা ভূমি !
যখনি যাহার তখনি তাহার , এই কি জননী তুমি !
সে কি মনে হবে একদিন যবে ছিলে দরিদ্রমাতা
আঁচল ভরিয়া রাখিতে ধরিয়া ফল ফুল শাক পাতা !
আজ কোন্ রীতে কারে ভুলাইতে ধরেছ বিলাসবেশ —
পাঁচরঙা পাতা অঞ্চলে গাঁথা , পুষ্পে খচিত কেশ !
আমি তোর লাগি ফিরেছি বিবাগি গৃহহারা সুখহীন —
তুই হেথা বসি ওরে রাক্ষসী , হাসিয়া কাটাস দিন !
ধনীর আদরে গরব না ধরে! এতই হয়েছ ভিন্ন
কোনোখানে লেশ নাহি অবশেষ সেদিনের কোনো চিহ্ন !
কল্যাণময়ী ছিলে তুমি অয়ি , ক্ষুধাহরা সুধারাশি !
যত হাসো আজ যত করো সাজ ছিলে দেবী , হলে দাসী ।
বিদীর্ণ হিয়া ফিরিয়া ফিরিয়া চারি দিকে চেয়ে দেখি —
প্রাচীরের কাছে এখনো যে আছে , সেই আমগাছ একি !
বসি তার তলে নয়নের জলে শান্ত হইল ব্যথা ,
একে একে মনে উদিল স্মরণে বালক - কালের কথা ।
সেই মনে পড়ে জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে রাত্রে নাহিকো ঘুম ,
অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি আম কুড়াবার ধুম ।
সেই সুমধুর স্তব্ধ দুপুর , পাঠশালা - পলায়ন —
ভাবিলাম হায় আর কি কোথায় ফিরে পাব সে জীবন !
সহসা বাতাস ফেলি গেল শ্বাস শাখা দুলাইয়া গাছে ,
দুটি পাকা ফল লভিল ভূতল আমার কোলের কাছে ।
ভাবিলাম মনে বুঝি এতখনে আমারে চিনিল মাতা ,
স্নেহের সে দানে বহু সম্মানে বারেক ঠেকানু মাথা ।
হেনকালে হায় যমদূত - প্রায় কোথা হতে এল মালী ,
ঝুঁটি - বাঁধা উড়ে সপ্তম সুরে পাড়িতে লাগিল গালি ।
কহিলাম তবে , ‘ আমি তো নীরবে দিয়েছি আমার সব —
দুটি ফল তার করি অধিকার , এত তারি কলরব ! '
চিনিল না মোরে , নিয়ে গেল ধরে কাঁধে তুলি লাঠিগাছ —
বাবু ছিপ হাতে পারিষদ - সাথে ধরিতেছিলেন মাছ ।
শুনি বিবরণ ক্রোধে তিনি কন , ‘ মারিয়া করিব খুন ! '
বাবু যত বলে পারিষদ - দলে বলে তার শতগুণ ।
আমি কহিলাম , ‘ শুধু দুটি আম ভিখ মাগি মহাশয় ! '
বাবু কহে হেসে , ‘ বেটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয় । '
আমি শুনে হাসি আঁখিজলে ভাসি , এই ছিল মোর ঘটে —
তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ , আমি আজ চোর বটে !
[কাহিনী]
ছড়া-রবী ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাঁচটা না বাজতেই ভুলুরাম শর্মা সে
টেরিটি বাজারে গেল মনিবের ফরমাশে।
মরেছে অতুল মামা, আজি তারি শ্রাদ্ধের
জোগাড় করতে হবে নানাবিধ খাদ্যের।
বাবু বলে, ভুলো না হে, আরো চাই দর্মা।
ভোলা কি সহজ কথা, বলে ভুলু শর্মা।
কাঁক্রোল কিনে বসে কাঁচকলা কিনতে।
শাঁকআলু কচু কিনা পারে না সে চিনতে।
বকুনি খেয়েছে যেই মাছওলা মিন্সের,
তাড়াতাড়ি কিনে বসে কামরাঙা তিন সের।
বাবু বলে, কামরাঙা এতগুলো হবে কী।
ভুলু বলে, কানে আমি শুনি নাই তবে কি।
দেখলেম কিনছে যে ও পাড়ার সরকার,
বুঝলেম নিশ্চয় আছে এর দরকার।
কানে গুঁজে নিয়ে তার হিসাবের লেখনী
বাবু বলে, ফিরে দিয়ে এসো তুমি এখনি।
মনিবের হুকুমটা শুনল সে হাঁ ক’রে,
ফিরে দিতে চ’লে গেল কিছু দেরি না ক’রে।
বললে সে, দোকানিকে যা করেছি জব্দ—
ফলগুলো ফিরে নিতে করে নি টুঁ শব্দ।
বাবু কয় ‘টাকা কই’ টান দিয়ে তামাকে।
ভুলু বলে, সে কথাটা বল নি তো আমাকে।
এসেছি উজাড় ক’রে বাজারের ঝুড়িটা—
দোকানির মাসি ছিল, হেসে খুন বুড়িটা।
পাঁচটা না বাজতেই ভুলুরাম শর্মা সে
টেরিটি বাজারে গেল মনিবের ফরমাশে।
মরেছে অতুল মামা, আজি তারি শ্রাদ্ধের
জোগাড় করতে হবে নানাবিধ খাদ্যের।
বাবু বলে, ভুলো না হে, আরো চাই দর্মা।
ভোলা কি সহজ কথা, বলে ভুলু শর্মা।
কাঁক্রোল কিনে বসে কাঁচকলা কিনতে।
শাঁকআলু কচু কিনা পারে না সে চিনতে।
বকুনি খেয়েছে যেই মাছওলা মিন্সের,
তাড়াতাড়ি কিনে বসে কামরাঙা তিন সের।
বাবু বলে, কামরাঙা এতগুলো হবে কী।
ভুলু বলে, কানে আমি শুনি নাই তবে কি।
দেখলেম কিনছে যে ও পাড়ার সরকার,
বুঝলেম নিশ্চয় আছে এর দরকার।
কানে গুঁজে নিয়ে তার হিসাবের লেখনী
বাবু বলে, ফিরে দিয়ে এসো তুমি এখনি।
মনিবের হুকুমটা শুনল সে হাঁ ক’রে,
ফিরে দিতে চ’লে গেল কিছু দেরি না ক’রে।
বললে সে, দোকানিকে যা করেছি জব্দ—
ফলগুলো ফিরে নিতে করে নি টুঁ শব্দ।
বাবু কয় ‘টাকা কই’ টান দিয়ে তামাকে।
ভুলু বলে, সে কথাটা বল নি তো আমাকে।
এসেছি উজাড় ক’রে বাজারের ঝুড়িটা—
দোকানির মাসি ছিল, হেসে খুন বুড়িটা।
লুকোচুরি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমি যদি দুষ্টুমি করে
চাঁপার গাছে চাঁপা হয়ে ফুটি,
ভোরের বেলা মা গো, ডালের ‘পরে
কচি পাতায় করি লুটোপুটি,
তবে তুমি আমার কাছে হারো,
তখন কি মা চিনতে আমায় পারো।
তুমি ডাক, ‘খোকা কোথায় ওরে। '
আমি শুধু হাসি চুপটি করে।
যখন তুমি থাকবে যে কাজ নিয়ে
সবই আমি দেখব নয়ন মেলে।
স্নানটি করে চাঁপার তলা দিয়ে
আসবে তুমি পিঠেতে চুল ফেলে;
এখান দিয়ে পুজোর ঘরে যাবে,
দূরের থেকে ফুলের গন্ধ পাবে—
তখন তুমি বুঝতে পারবে না সে
তোমার খোকার গায়ের গন্ধ আসে।
দুপুর বেলা মহাভারত-হাতে
বসবে তুমি সবার খাওয়া হলে,
গাছের ছায়া ঘরের জানালাতে
পড়বে এসে তোমার পিঠে কোলে,
আমি আমার ছোট্ট ছায়াখানি
দোলাব তোর বইয়ের ‘পরে আনি—
তখন তুমি বুঝতে পারবে না সে
তোমার চোখে খোকার ছায়া ভাসে।
সন্ধেবেলায় প্রদীপখানি জ্বেলে
যখন তুমি যাবে গোয়ালঘরে
তখন আমি ফুলের খেলা খেলে
টুপ্ করে মা , পড়ব ভুঁয়ে ঝরে।
আবার আমি তোমার খোকা হব,
‘গল্প বলো' তোমায় গিয়ে কব।
তুমি বলবে, ‘দুষ্টু, ছিলি কোথা। '
আমি বলব, ‘ বলব না সে কথা। '
আমি যদি দুষ্টুমি করে
চাঁপার গাছে চাঁপা হয়ে ফুটি,
ভোরের বেলা মা গো, ডালের ‘পরে
কচি পাতায় করি লুটোপুটি,
তবে তুমি আমার কাছে হারো,
তখন কি মা চিনতে আমায় পারো।
তুমি ডাক, ‘খোকা কোথায় ওরে। '
আমি শুধু হাসি চুপটি করে।
যখন তুমি থাকবে যে কাজ নিয়ে
সবই আমি দেখব নয়ন মেলে।
স্নানটি করে চাঁপার তলা দিয়ে
আসবে তুমি পিঠেতে চুল ফেলে;
এখান দিয়ে পুজোর ঘরে যাবে,
দূরের থেকে ফুলের গন্ধ পাবে—
তখন তুমি বুঝতে পারবে না সে
তোমার খোকার গায়ের গন্ধ আসে।
দুপুর বেলা মহাভারত-হাতে
বসবে তুমি সবার খাওয়া হলে,
গাছের ছায়া ঘরের জানালাতে
পড়বে এসে তোমার পিঠে কোলে,
আমি আমার ছোট্ট ছায়াখানি
দোলাব তোর বইয়ের ‘পরে আনি—
তখন তুমি বুঝতে পারবে না সে
তোমার চোখে খোকার ছায়া ভাসে।
সন্ধেবেলায় প্রদীপখানি জ্বেলে
যখন তুমি যাবে গোয়ালঘরে
তখন আমি ফুলের খেলা খেলে
টুপ্ করে মা , পড়ব ভুঁয়ে ঝরে।
আবার আমি তোমার খোকা হব,
‘গল্প বলো' তোমায় গিয়ে কব।
তুমি বলবে, ‘দুষ্টু, ছিলি কোথা। '
আমি বলব, ‘ বলব না সে কথা। '
আয়না দেখেই চমকে বলে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আয়না দেখেই চমকে বলে,
"মুখ যে দেখি ফ্যাকাশে,
বেশিদিন আর বাঁচব না তো--'
ভাবছে বসে একা সে।
ডাক্তারেরা লুটল কড়ি,
খাওয়ায় জোলাপ, খাওয়ায় বড়ি,
অবশেষে বাঁচল না সেই
বয়স যখন একাশি।
[খাপছাড়া]
"মুখ যে দেখি ফ্যাকাশে,
বেশিদিন আর বাঁচব না তো--'
ভাবছে বসে একা সে।
ডাক্তারেরা লুটল কড়ি,
খাওয়ায় জোলাপ, খাওয়ায় বড়ি,
অবশেষে বাঁচল না সেই
বয়স যখন একাশি।
[খাপছাড়া]
সুপ্রভাত
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রুদ্র , তোমার দারুণ দীপ্তি
এসেছে দুয়ার ভেদিয়া ;
বক্ষে বেজেছে বিদ্যুৎবাণ
স্বপ্নের জাল ছেদিয়া ।
ভাবিতেছিলাম উঠি কি না উঠি ,
অন্ধ তামস গেছে কিনা ছুটি ,
রুদ্ধ নয়ন মেলি কি না মেলি
তন্দ্রা-জড়িমা মাজিয়া ।
এমন সময়ে , ঈশান , তোমার
বিষাণ উঠেছে বাজিয়া ।
বাজে রে গরজি বাজে রে
দগ্ধ মেঘের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে
দীপ্ত গগন-মাঝে রে ।
চমকি জাগিয়া পূর্বভুবন
রক্তবদন লাজে রে ।
ভৈরব , তুমি কী বেশে এসেছ ,
ললাটে ফুঁসিছে নাগিনী ,
রুদ্র-বীণায় এই কি বাজিল
সুপ্রভাতের রাগিণী ?
মুগ্ধ কোকিল কই ডাকে ডালে ,
কই ফোটে ফুল বনের আড়ালে ?
বহুকাল পরে হঠাৎ যেন রে
অমানিশা গেল ফাটিয়া ;
তোমার খড়্গ আঁধার-মহিষে
দুখানা করিল কাটিয়া ।
ব্যথায় ভুবন ভরিছে ,
ঝর ঝর করি রক্ত-আলোক
গগনে-গগনে ঝরিছে ,
কেহ-বা জাগিয়া উঠিছে কাঁপিয়া
কেহ-বা স্বপনে ডরিছে ।
তোমার শ্মশানকিঙ্করদল ,
দীর্ঘ নিশায় ভুখারি ।
শুষ্ক অধর লেহিয়া লেহিয়া
উঠিছে ফুকারি ফুকারি ।
অতিথি তারা যে আমাদের ঘরে
করিছে নৃত্য প্রাঙ্গণ- ' পরে ,
খোলো খোলো দ্বার ওগো গৃহস্থ ,
থেকো না থেকো না লুকায়ে —
যার যাহা আছে আনো বহি আনো ,
সব দিতে হবে চুকায়ে ।
ঘুমায়ো না আর কেহ রে ।
হৃদয়পিণ্ড ছিন্ন করিয়া
ভাণ্ড ভরিয়া দেহো রে ।
ওরে দীনপ্রাণ , কী মোহের লাগি
রেখেছিস মিছে স্নেহ রে ।
উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ,
‘ ভয় নাই , ওরে ভয় নাই —
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই । '
হে রুদ্র , তব সংগীত আমি
কেমনে গাহিব কহি দাও স্বামী —
মরণনৃত্যে ছন্দ মিলায়ে
হৃদয়ডমরু বাজাব ,
ভীষণ দুঃখে ডালি ভরে লয়ে
তোমার অর্ঘ্য সাজাব ।
এসেছে প্রভাত এসেছে ।
তিমিরান্তক শিবশঙ্কর
কী অট্টহাস হেসেছে!
যে জাগিল তার চিত্ত আজিকে
ভীম আনন্দে ভেসেছে ।
জীবন সঁপিয়া , জীবনেশ্বর ,
পেতে হবে তব পরিচয় ;
তোমার ডঙ্কা হবে যে বাজাতে
সকল শঙ্কা করি জয় ।
ভালোই হয়েছে ঝঞ্ঝার বায়ে
প্রলয়ের জটা পড়েছে ছড়ায়ে ,
ভালোই হয়েছে প্রভাত এসেছে
মেঘের সিংহবাহনে —
মিলনযঞ্ জে অগ্নি জ্বালাবে
বজ্রশিখার দাহনে ।
তিমির রাত্রি পোহায়ে
মহাসম্পদ তোমারে লভিব
সব সম্পদ খোয়ায়ে —
মৃত্যুর লব অমৃত করিয়া
তোমার চরণে ছোঁয়ায়ে ।
[পূরবী]
রুদ্র , তোমার দারুণ দীপ্তি
এসেছে দুয়ার ভেদিয়া ;
বক্ষে বেজেছে বিদ্যুৎবাণ
স্বপ্নের জাল ছেদিয়া ।
ভাবিতেছিলাম উঠি কি না উঠি ,
অন্ধ তামস গেছে কিনা ছুটি ,
রুদ্ধ নয়ন মেলি কি না মেলি
তন্দ্রা-জড়িমা মাজিয়া ।
এমন সময়ে , ঈশান , তোমার
বিষাণ উঠেছে বাজিয়া ।
বাজে রে গরজি বাজে রে
দগ্ধ মেঘের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে
দীপ্ত গগন-মাঝে রে ।
চমকি জাগিয়া পূর্বভুবন
রক্তবদন লাজে রে ।
ভৈরব , তুমি কী বেশে এসেছ ,
ললাটে ফুঁসিছে নাগিনী ,
রুদ্র-বীণায় এই কি বাজিল
সুপ্রভাতের রাগিণী ?
মুগ্ধ কোকিল কই ডাকে ডালে ,
কই ফোটে ফুল বনের আড়ালে ?
বহুকাল পরে হঠাৎ যেন রে
অমানিশা গেল ফাটিয়া ;
তোমার খড়্গ আঁধার-মহিষে
দুখানা করিল কাটিয়া ।
ব্যথায় ভুবন ভরিছে ,
ঝর ঝর করি রক্ত-আলোক
গগনে-গগনে ঝরিছে ,
কেহ-বা জাগিয়া উঠিছে কাঁপিয়া
কেহ-বা স্বপনে ডরিছে ।
তোমার শ্মশানকিঙ্করদল ,
দীর্ঘ নিশায় ভুখারি ।
শুষ্ক অধর লেহিয়া লেহিয়া
উঠিছে ফুকারি ফুকারি ।
অতিথি তারা যে আমাদের ঘরে
করিছে নৃত্য প্রাঙ্গণ- ' পরে ,
খোলো খোলো দ্বার ওগো গৃহস্থ ,
থেকো না থেকো না লুকায়ে —
যার যাহা আছে আনো বহি আনো ,
সব দিতে হবে চুকায়ে ।
ঘুমায়ো না আর কেহ রে ।
হৃদয়পিণ্ড ছিন্ন করিয়া
ভাণ্ড ভরিয়া দেহো রে ।
ওরে দীনপ্রাণ , কী মোহের লাগি
রেখেছিস মিছে স্নেহ রে ।
উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ,
‘ ভয় নাই , ওরে ভয় নাই —
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই । '
হে রুদ্র , তব সংগীত আমি
কেমনে গাহিব কহি দাও স্বামী —
মরণনৃত্যে ছন্দ মিলায়ে
হৃদয়ডমরু বাজাব ,
ভীষণ দুঃখে ডালি ভরে লয়ে
তোমার অর্ঘ্য সাজাব ।
এসেছে প্রভাত এসেছে ।
তিমিরান্তক শিবশঙ্কর
কী অট্টহাস হেসেছে!
যে জাগিল তার চিত্ত আজিকে
ভীম আনন্দে ভেসেছে ।
জীবন সঁপিয়া , জীবনেশ্বর ,
পেতে হবে তব পরিচয় ;
তোমার ডঙ্কা হবে যে বাজাতে
সকল শঙ্কা করি জয় ।
ভালোই হয়েছে ঝঞ্ঝার বায়ে
প্রলয়ের জটা পড়েছে ছড়ায়ে ,
ভালোই হয়েছে প্রভাত এসেছে
মেঘের সিংহবাহনে —
মিলনযঞ্ জে অগ্নি জ্বালাবে
বজ্রশিখার দাহনে ।
তিমির রাত্রি পোহায়ে
মহাসম্পদ তোমারে লভিব
সব সম্পদ খোয়ায়ে —
মৃত্যুর লব অমৃত করিয়া
তোমার চরণে ছোঁয়ায়ে ।
[পূরবী]
Subscribe to:
Posts (Atom)